জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। আমার মনে হয়, এ বিষয়ে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, থাকার কথাও না।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ব্যক্তিপরিচয়ের বাইরে তিনি একজন মানুষ ছিলেন, তো একজন মানুষকে স্বপরিবারে হত্যা করা হলো আর এই হত্যাকারীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে তিনি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করলেন কেন ?
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ ।
একটু লক্ষ করুন যে অধ্যাদেশটি জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক; তবে এর বৈধতা দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে বুঝতে সহজ হবে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ এ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। আর মোশতাক সরকার ছিলো সম্পূর্ণ ভাবে সেনাসমর্থিত সরকার।
স্বচ্ছ একটি ব্যাপার জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালীন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। যেহেতু মোশতাক সরকার ছিলো সেনাসমর্থিত। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান সেহেতু এর দায় তিনি এড়াতে পারেন না!
‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর রয়েছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর আধ্যাদেশে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে।
অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসাবে আবিভূর্ত হন। সে সময় বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।
একটু লক্ষ করুন, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যবস্থা না নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিলেন এবং ঐ সময়ে একটি প্রপাগন্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন হবে না। এবং এই দোহাই দিয়েই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত এবং অত্যন্ত নির্লজ্জ্ব ভাবে জিয়াউর রহমান খুনীদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকুরী ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে পোষন করেন, যা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য অত্যন্ত বেবনাদায়ক ও লজ্জাজনক।
পৃথিবীর কোথাও এই ধরণের নির্মম কালো কালো আইন নেই , উল্লেখ করে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী, পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির প্রধান বেনজির ভুট্টো, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বন্দর নায়েককে গুলিতে হত্যার পর কোন দেশেই এমন ন্যক্কারজনক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়নি।
তাই বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে চাই মোশতাক ছিলো জিয়ার ধারা পরিচালিত মূল সিদ্ধান্ত আসতো জিয়ার নিকট থেকে তাই ইনডমটিনিটির সকল দায় জিয়ার এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই ।


