ইয়াকুব শাহরিয়ার
আমরা সদরবাসী, সুতরাং যা হবে আমাদের এখানে হবে কিংবা হতে হবে অথবা হওয়া উচিৎ এমন একমুখী বা অপরিপক্ক চিন্তা থেকে মহাজনদের বেরিয়ে আসা উচিৎ। যে জায়গায় বসে আপনারা মহাজনি করেছেন সময় আর সে জায়গায় থেমে থাকেনি। সময় বয়ে চলেছে উত্তরাধুনিক যুগ বা পথের দিকে। জেনারেশন আলফা এখন ট্রেন্ডিং-এ। চিন্তা শক্তি তাদের একটু বেশিই প্রখর। তারা বিশ্বকে বদলে দিতে যে শব্দটিকে তুমুলভাবে ব্যবহার করছে তা হচ্ছে প্ল্যানেটারি থিংকিং। যা পৃথিবীকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা। যেখানে জলবায়ু, পরিবেশ ও মানবকল্যাণকে একসঙ্গে দেখা হয় এক ব্র্যাকেটের ভিতরে। সেখানে আপনারা সদর আর দক্ষিণ চিন্তায় চরম মশগুল। নতুনরা যখন ‘এক পৃথিবী এক গ্রাম’ সূত্রে পৃথিবীটাকে বাঁধতে চাইছে, আপনারা তখন শহর আর দেখার হাওরকে দুই মেরুর দূরত্বের বাটখারা দিয়ে পরিমাপ করছেন। কথাগুলো একটু সরাসরি হয়ে যাচ্ছে, হওয়া উচিতও। সরাসরি কথা সহজ, কঠিন ও মধ্য মানের পাঠকদের বুঝতে সুবিধে হবে বেশ। আপনারা কিছু মনে করবেন না প্লিজ। আমরা আমাদের কথা বলতে হবে, একসময় সেটা আপনাদেরও কথা হয়ে উঠবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
কবির কথা অনুকরণ করে বলতে হয়-
সে যুগ হয়েছে বাসী
যে যুগে সদর ছিলো শুধু রাজ, মফস্বল ছিলো দাসী।
মহাজনদের সেই পুরোনো বোধশক্তি এখনো রয়ে গেছে। এগুলোতে একটু পরিবর্তন আনা দরকার। একই ধাঁচের চিন্তা, কুক্ষিগত ভাবনা এখন আর সমাজ দেখতে চায় না। চিন্তাটাকে বড় করতে হবে। ইংরেজিতে একটি বাক্য আছে; Think outside the Box. এই বাক্যটি এককালে আমার এক টিশার্টে লেখা ছিলো৷ নতুন করে বললে এখন বলবো বৃত্তের বাইরে কিংবা এককেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যুগের সাথে অবশ্যই তাল মিলাতে হবে। পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট পরিধি তো আছে বটেই, কিন্তু চিন্তার পরিধি নেই। একটা কথা জনাব সিনিয়ররা বলে বেরাচ্ছেন যে, দেখার হাওরের পরিবেশ রক্ষা হবে। ধ্বংস হবে সবকিছু। এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্নও তাঁরা। তাঁদের এই উদ্বেগ পরিবেশ রক্ষায় অবশ্যই প্রসংশার দাবি রাখে। কথা হচ্ছে সেটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কেনো? এই যে ধরুন সুনামগঞ্জ সদরে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের চার কিলোমিটার ও শান্তিগঞ্জ অংশে দুই কিলোমিটার পথে হাজার হাজার বৃক্ষ কর্তন করা হয়েছে। রাস্তার উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এতো গাছকে হত্যা করা হলো তখন কি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেনি? অন্তত একটু কথা বলাও কি যেতো না? আচ্ছা, আপনারা জেলা সদরের উপকূলে ইউনিভার্সিটি চাইছেন, ভালো কথা। ভার্সিটির জন্য এতো বিশাল জায়গা আপনারা কোথায় দিবেন? সেখানে পরিবেশের বিঘ্ন ঘটবে না। এখন যেখানে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল, সরকারি কলেজ, নতুন পাড়ার বর্ধিত অংশ এগুলো আসলে কোন শহরের বুকে হয়েছে? সূক্ষ্ম ভাবে চিন্তা করতে হবে না, একটু খেয়াল করে দেখলে বুঝা যাবে যে এসব স্থাপনাগুলো একরকম নয় পুরোপুরিভাবে দেখার হাওরের ভিতরেই পড়েছে। এবং আপনার আমার দেখার হাওরে। দেখার হাওর এখন সুনামগঞ্জ শহর।
আচ্ছা, আমি অল্পবিস্তর শিক্ষিত মানুষ। ভারী কথার ওজন নেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। তবু আমার মন জানতে চায়, সুনামগঞ্জ সদরে বা শহরের উপকণ্ঠে কোন জায়গা আছে যে, হাওর ব্যবহার না করে এতো বিশাল একটি ক্যাম্পাস স্থাপন করা যাবে? সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের না চাইতে পাওয়া সম্পদ বললেও বেশ অত্যুক্তি হবে বলে মনে হচ্ছে না। একটা ভালো মানের কলেজ, বড় স্কুল স্থাপন যখন আমাদের স্বপ্ন ছিলো তখন হঠাৎ করে হাতে চাঁদ ধরা দেওয়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয় চলে এলো সুনামগঞ্জে। সম্ভবত ২০১১ সালে ‘মাননীয় সরকার’ নামের এক কবিতায় দাবি করেছিলাম; হারিকেনের আলোয় মানুষ কতটাই বা পথ চলতে পারে? আমাদের এখানে অন্ধকারে পথ দেখানোর জন্য নেই কেনো উজ্জ্বল টর্চলাইট? উজ্জ্বল টর্চলাইট বলতে সেদিন ইউনিভার্সিটির কথা বুঝাতে চেয়েছিলাম। আমার সেই কবিতা সত্যের আলো নামক একটি বার্ষিক ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছিলো। সংরক্ষণ করে রেখেছি। কবিতাটি কারো কর্ণকুহরে না পৌঁছালেও আমরা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছি।
বুকের মানিক হারানোর ব্যথা তারা বেশি বুঝে যারা কষ্টেসৃষ্টে মানিক পালন করে। হঠাৎ পাওয়া বস্তুর জন্য দরদ কম থাকে। আমাদের সুনামগঞ্জী মহাজনদের এখন সেই দশা। না চেয়ে পাওয়া অতিগুরুত্বপূর্ণ ভার্সিটি নিয়ে টানাটানি শুরু করেছেন। কোথায় হবে সেটা পূর্ব নির্ধারিত ও মীমাংসিত বিষয়। এ বিষয় নিয়ে নতুন করে তারা শুরু করেছেন টানাহেঁচড়া। এটি তারা কেনো করছেন? কেউ কেউ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে যারা সরানোর জন্য উপস্থিত মুহুর্তে চেষ্টা করছেন, তারা আসলে নিজেদের স্বার্থে এই চিন্তা করছেন৷ আরো কত কী বলছেন। দেশের সকল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে শহরের বাইরে। আর আপনারা নিতে চাইছেন শহরে। কেনো? শহরে বা তার পাশে আপনাদের কিছু জায়গা আছে বলে? শহরে আপনাদের বহুতল ভবন আছে? এগুলোর প্রোপার ইউট্রিলাইজ করতে চান? এসব অনেক কারণ থাকতে পারে বলে লোকজন আলাপ করেন। ‘সমজদার’ লোকদের বিরুদ্ধে এসব কথা শুনতে একদমই ভালো লাগে না।
এখন আসি শঙ্কার কথায়। একটি শঙ্কার কথা শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ প্রায়ই বক্তব্যে বলেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এমন ভাবে টানাটানি করতে থাকলে জায়গার সিদ্ধান্তহীনতায় সরকার বিকল্প চিন্তা নিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যেমন: পার্শ্ববর্তী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সিদ্ধান্তহীন বিশ্ববিদ্যালয়কে (সুবিপ্রবিকে) Merge (মার্জ) বা একীভূত করে দিতে পারে। এই শঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ভবন নেই, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নেই। প্রশাসনের লোকজন যদি মনে করেন- সিদ্ধান্ত হোক, পরে আমরা আসবো, আপাতত অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যুক্ত হয়ে যাই। তাহলে সুনামগঞ্জবাসীর পায়ে কুড়ালটি ভালো করেই পড়বে। একবার যদি এমন অঘটন ঘটে যায় তাহলে এই ইউনিভার্সিটি সুনামগঞ্জের স্বপ্নই থেকে যাবে। এছাড়াও আরো অনেক সমস্যা আছে৷ শিক্ষার্থীদের উপর পরোক্ষ প্রভাব বলতেও একটি কথা আছে। এতোসব নেগেটিভিটির মধ্যে আমাদের আশার কথা হচ্ছে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য আমাদেরকে আশান্বিত করেছে। তিনি একাধারে প্রতিষ্ঠানটির সম্মিলিত সিন্ডিকেট মেম্বারও। বিজ্ঞ সাংসদ ও ভার্সিটির সিন্ডিকেট মেম্বার কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের উপস্থিতিতে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, বোধকরি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনও পূর্ব নির্ধারিত স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষে থাকবেন। তাঁর কাছে আমরা এ আশা করতেই পারি। তাছাড়া সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর অনেক টাকাও ইতোমধ্যে খরচ করেছে। ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ হিসেবে শান্তিগঞ্জে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে দুই কিলোমিটার সড়কে চারলেন প্রকল্পও করা হয়েছে সুবিপ্রবির কথা মাথায় রেখে। আমরা আজ কিংবা আগামীকালের চিন্তা করছি কেনো? আমরা শতাব্দী কাল পরের চিন্তা করি না কেনো? চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না কেনো?
পল্লী কবি জসীম উদ্দিন বলেছেন, আমার ঘরের মাটির প্রদীপ আলোকে দিবে সবে। বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু মাটির প্রদীপ নয়, উজ্জ্বল টর্চ লাইট এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। সুনামগঞ্জ জেলার জন্য একটি শিক্ষার সূর্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয় সুনামগঞ্জ জেলাকে আলোকিত করে তুলতে পারে। বিশ্বাস করি আলোকিত করে তুলবেও। তাই স্থান পরিবর্তন নামক আন্দোলন করে বাধাগ্রস্থ করে নয়, সুন্দর পরামর্শ, আলোকিত চিন্তা শক্তি মিশিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি ক্যাম্পাস কীভাবে করা যায় সেই বিষয়ে কথা বলুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে নদী থাকবে, স্রোতস্বিনী নদী। প্রকৌশলীগণ চিন্তা করে নদী তৈরি করবেন; ময়ূরাক্ষীর মতো কখনো শান্ত, কখনো স্রোতস্বিনী। সেই নদীতে উচ্ছ্বল শিক্ষার্থীরা নৌকায় করে ঘুরে ফিরবে। হাওর নিয়ে গবেষণা করার মতো উন্মুক্ত শ্রেণি কক্ষ থাকবে। পরিযায়ী পাখি, দেশি দোয়েল, শালিক, কাক, কোকিলের অভয়ারণ্য হবে। আলাদা সংরক্ষণশালা থাকবে তাদের জন্য। হলগুলোর নাম কী হবে? হাসন রাজা হল, বাউল সম্রাট আবদুল করিম, জ্ঞানের সাগর দুর্বীন শাহ, রাধারমণ দত্ত কিংবা পাগল হাসানের নামে। টাঙ্গুয়া, মহাসিং, যাদুকাটা ইত্যাদি। হাওরাঞ্চলের গান নিয়ে গবেষণা কেন্দ্র থাকবে। হাওরের অক্সফোর্ড হবে এই ইউনিভার্সিটি। এসব নিয়ে ভাববার সময় এখন। প্রবন্ধ, সংবাদ লিখে এসব ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার কথা। এসব লেখা পড়ে শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন বুনা শুরু করুক সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল নিয়ে। এখানে সুন্দর কিছু হতে চলেছে। বাঁধা দিয়ে, টানাহেঁচড়া করে বিলম্ব করা যাবে, কিন্তু চিন্তার প্রখরতা মুক্তি পাবে না। চিন্তাকে বাইরে নিয়ে আসতে হবে। বৃত্তের বাইরে চিন্তা করতে হবে।
আসুন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে কাজ করি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালকে নিয়ে।
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক।


