ঈদের আনন্দ আমাদের সমাজের নিম্নআয়ের মানুষের আনন্দ-বেদনার ঈদ-উল আজহা উদযাপন ও করোনাভাইরাস মধ্যে ঈদ উৎসব ও স্বাস্থ্যবিধি।
ঈদ শব্দটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষজন মেতে উঠেন আনন্দ উদযাপনে। কারণ চড়াই-উতরাই পেরোনো জীবনে আমরা কতটুকুই বা সুযোগ পাই আনন্দে মেতে ওঠার। তাই তো এসব উপলক্ষ আমাদের ভরিয়ে দেয় নিরন্তর আনন্দধারায়। অথচ এবারের ঈদ যে অন্যবারের মতো অপার খুশিতে ভরিয়ে দিতে পারছে না। এই ম্রিয়মানতার, ম্লানতার কারণগুলো সবারই জানা। আরও বৃহৎ করে বললে বিশ্বের কয়েক কোটি মুসলমানের মনে ঈদের প্রকৃত আনন্দ নেই। প্রথমত করোনা নামক অদৃশ্য ভাইরাসের কারণে সেই আনন্দ অনেকটা সাদামাটা। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের চিত্র প্রায় একই রকম। এর বিরূপ প্রভাবে প্রায় থমকে গেছে পুরো বিশ্ব। থেমে গেছে প্রায় ছয়শ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাও।
এমন পরিস্থিতির মূল কারণ প্রতিদিনই সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। কঠিন এমন অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবেন তা কেউ বলতে পারছে না। কারণ এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনো সফল প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। তাই করোনাভাইরাস বিষয়ে সবার মধ্যে কাজ করছে ভয়। আপাতত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘরে থাকাটা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, এটাই পথ। তাই সেই পথেই হাঁটছে পুরো বিশ্ব। করোনার মধ্যে গত চার মাসে অনেক মানুষ তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন। কেউবা হারিয়েছেন বাবা, কেউবা মা। আবার অনেকে হারিয়েছেন প্রিয় সন্তানও। নিকটাত্মীয় হারানোর সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবেশীর মৃত্যুও দেখেছে অনেকে। পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় এখনও অনেকেই করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সময়ের স্রোতে চলে এসেছে ঈদুল আজহা।
টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এবারের বন্যা সাম্প্রতিক বছরগুলো থেকে অনেক বেশি সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হবে। আর এ কারণে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরাই। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। এবারের বন্যায় দেশের প্রায় অনেক জেলায় আউশ, আমন ধানের বীজতলা থেকে শুরু করে ক্ষতি হয়েছে অনেক সবজি বাগানের। এখানে আরও একটি শঙ্কার খবর হল, বন্যার পানির সঙ্গে কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে নদীভাঙন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়েছে অনেক পরিবার। তাই তাদের কাছে ঈদের আনন্দ নেই। কীভাবে বেঁচে থাকবেন সেই চিন্তা সবার মধ্যে।
তবে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতি কাটাতে কৃষকদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও করা হচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের। তবে সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। এর জন্য বানভাসি সবার পাশে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে বিত্তশালীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এসব অসহায় মানুষ কীভাবে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে সে উদ্যোগও নিতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আগে অনেকে কয়েক ভাগে দিলেও এবার সেটাও পারছেন না। ভালো নেই নিম্নআয়ের মানুষও। অন্যের সাহায্যের জন্য তাকিয়ে আছেন তারা। তবে করোনায় পরিস্থিতির মধ্যেও যেসব বিত্তশালীরা পশু কোরবানি দেবেন তারা যেন আশপাশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা মাথায় রাখেন। মাংসের একটি অংশ তাদের দিলে কিছুটা হলেও আনন্দ ফুটে উঠবে এসব নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের পরিবারে।
প্রতি বছরের মতো এবারের ঈদুল আজহা সেই অপার আনন্দের বার্তা নিয়ে আসছে না এটা সত্যি। তবে এটাও সত্য বাঙালি এমনিতেই লড়াকু জাতি। সব সময় অনেক কিছুর সঙ্গে লড়াই করে জীবন ধারণ করে। এবারও করোনা ও বন্যার সঙ্গে লড়াই করে ঠিকই বিজয়ী হবে বাঙালি। এর জন্য সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তবেই হয়তো কঠিন এই পরিস্থিতিতে ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। আর একটি কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে, করোনার এমন সময়ে ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে যেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে ভুল না হয়। করোনা পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় এখনও সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এতে নিজে নিরাপদ থাকব ও অন্যকে নিরাপদে রাখব। সবার প্রতি রইল ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।


