শিক্ষায় মনের জাগরণ: আমাদের জাতীয় উন্নয়ন

প্রকাশিত: ১:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০ 728 views
শেয়ার করুন

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানুষ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ হচ্ছে মন+হুশ= মানুষ। সহজ অর্থে যার মন ও হুশ আছে তাকেই বলে মানুষ। মানুষের মন কেন দেয়া হলো ? মানুষের মন দেয়া হয়েছে কোন কিছু সর্ম্পকে চিন্তাভাবনা করার জন্য। মানুষের মন কখনো ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করে আবার কখনো নেতিবাচক। সেই জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছায় যাদের চিন্তাভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তির জগত ইতিবাচক এবং বহুমাত্রায় বৈচিত্র্যময়তার অফুরন্ত খনি। সারাবিশ্বে বিভিন্ন ধরণের রাষ্ট্র আছে।

এর কোনটি চরম মাত্রায় উন্নত, কোনটি মধ্যমানের আবার কোনটি অতি নি¤œতর জীবন পরিচালনা করছে। যে সকল রাষ্ট্র উন্নত জীবন যাপন করছে এবং যে সব রাষ্ট্র মধ্যমান ও নি¤œতর জীবন যাপন করছে সেসব রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে মূল পার্থক্যটা খুঁজে পাবেন। কেন একটি রাষ্ট্র এর মানুষ উন্নত জীবন যাপন করছে আবার অন্যদিকে আরেকটি রাষ্ট্রের মানুষেরা অভাব অনটনে নি¤œতর কষ্টে জীবন অতি মানবেতর জীবন যাপন করছে চরম দু:খ কষ্ট দারিদ্র্যের মাঝে। বিশ্ব সভ্যতার উন্নত ধারার রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন,কানাডা, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ইতালি, জাপান, নরওয়ে, জাপান,নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইত্যাদি। এসব রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং মানসম্মত। মাননসম্মত শিক্ষার প্রভাবে দেশের জনসাধারণের মনোভাবও হয় উন্নত। এসব আমরা প্রমাণ পাই ঐ রাষ্ট্রের মানুষের আচার আচরণে, কার্যকলাপে।

আমাদের দেশের শিক্ষায় শিখানো হয় শুধু প্রতিযোগিতা আর বিশ্বের ঐ সকল দেশে তাদের শিক্ষার্থীদের শেখায় কিভাবে জীবনে সফল হতে হয়, মানুষের সাথে কিভাবে মিশতে হয়, নিজ আগ্রহের ভিত্তিতে কিভাবে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। আমাদের দেশের যে গণিত ও বিজ্ঞান ভালো বুঝে তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ানোর সুপারিশ করা হয় অথচ এই ছেলেটি হয়তো পড়তে চেয়েছিল সাহিত্য সংস্কৃতি। আবার যে ছেলেটি গণিতে খারাপ করলো তাকে আর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে সুপারিশ করা হয় না বরং জোর জবরদস্তি করে গনিমত হিসেবে দেয়া হলো সাধারণ বিভাগে। এতে আসলে লাভ না ক্ষতি হচ্ছে সেটা বুঝার কোন উপায় আমাদের সমাজের মাথাওয়ালাদের কাছে নাই কারণ তাদের কোন মাথাই নেই আছে শুধু হুটহাট সিদ্ধান্ত নেয়ার চরম ক্ষমতা।

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী (২০২০) করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবা। যার কারণে বিশ্বজুড়ে অগণিত প্রাণ চলে গিয়েছে মহাজাগতিক ভ্রমনে। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে এর প্রকোপে অথচ আমাদের দেশের জনসাধারণ বড্ড সাহসী। এরা মনমুগ্ধকারী বসন্তের হাওয়া শরীরে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যদি এখন কোন বসন্ত নয়। করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় তাৎকালীন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এর যথাযথ প্রয়োগও শুরু হয়েছে। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কি মানুষের কোন অভ্যাস বদলানো যায়। এই ভয়াল দু:সময়ে মানুষজন রাস্তায় বের হলে মুখে মাস্ক ব্যবহার করেছেন আবার কেউ হাতে গ্লাভস ব্যবহার করেছেন, কেউ কারো সাথে হাত মিলাচ্ছে না, কোলাকুলি করছে না। বিভিন্ন জায়গায় স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতসব কর্মকান্ড অবশ্যই ভালো কাজ তবে পরিতাপের ও সন্দেহের বিষয় হলো এ অভ্যাস আমরা কয়দিন ধরে রাখবো । আমরা যা করি ঠেলায় পড়ে করি আবার ঠেলা যখন শেষ আমাদের দুদিনের সুঅভ্যাসও শেষ হয়ে যায়। এই যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এখন মানুষ খুব বেশি ভাবছে, সচেতন থাকছে সেটি ভালো কিন্তু এই হাইজিন এডুকেশন তো পরিবারে এবং বিদ্যালয়ে চর্চা করার কথা। মানুষের শিক্ষার সূচনা হয় পরিবারে আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হয় নিপুনভাবে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শিক্ষায় সঠিকভাবে শিক্ষা দেয়া হয়। বিদ্যালয়ে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা শেখার কথা বেশি কিন্তু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এখন শিখছে কিভাবে পরীক্ষায় বেশি মার্কস পাওয়া যায়, কিভাবে বেশি পড়া মুখস্থ করা যায়, বাসায় গিয়ে খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে কিভাবে আবার হোম টিউটরের কাছে পড়া যায়। শুধুই পড়ার মুখস্থকরণ আর পরীক্ষায় ভালো নাম্বার প্রাপ্তির মাঝে সীমাবদ্ধ আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার দৌড় যখন অধিক মাত্রায় মুখস্থ বিদ্যা আর পরীক্ষামুখী তখন শুধু জাতীয় ভবিষ্যতে শিক্ষিতের হার বাড়ে কিন্তু প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে না।

শিক্ষার এমন প্রভাবে জাতীয় জীবন হয়ে যাবে শুধু একমুখী জীবন ধারণ। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হলো মানুষের মনকে জাগানো। মন জাগলে জাগবে সবকিছু, ভেঙে যাবে চিরায়ত প্রথা, গড়ে ওঠবে সুস্থ সুন্দর জীবনধারার পথ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সবই হয়ে থাকে অথচ সবথেকে যা করা প্রয়োজন সেটিই করা হয় না। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুসারে আমাদের সবথেকে বেশি প্রয়োজন শিক্ষার্থীর মনের জাগরণ। মনের জাগরণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ চিন্তাধারায় পরিশুদ্ধ মানুষে পরিনত করবে। তখন আলাদাভাবে বুঝিয়ে কিংবা প্রশাসন দিয়ে বুঝাতে হবে কোন মহামারী কিংবা বিপদের সময় কি করত হবে । কিভাবে নিজেকে এবং সমাজকে রক্ষা করতে হয়। শিক্ষা মানুষের জীবনধারায় বদল আনে। শিক্ষার সাথে জীবনের সর্ম্পক যেমন ঠিক তেমনি সর্ম্পক আছে সভ্যতা সংস্কৃতির। সভ্যতা, সংস্কৃতি আর শিক্ষার চর্চা চলছে মহাকালের মহাপরিক্রমায়। এই তিনটি বহুদিকে প্রবাহমান। সভ্যতা, সংস্কৃতি আর শিক্ষার গতিপথ বাধাগ্রস্থ হলে ক্ষতির সম্মুখীন হয় মানবিক বুদ্ধিময় বিকাশধারা। শিক্ষা ও সংস্কৃতির যুগলবন্ধনে গড়ে ওঠে সভ্যতা।

যে জাতির শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে উন্নত যে জাতির সভ্যতা ততই উন্নত। এরিষ্টটল বলেন “ সুস্থ দেহে সুস্থ সুস্থ মন তৈরির নামই শিক্ষা।” আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কি একজন শিক্ষার্থী সুস্থ দেহ গঠনের উপায় জানে অথবা সেই পথ দেখিয়ে দেয়া হয়, সুস্থ মন তৈরি করার উপায় বলে দেয়া হয় কি? বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুসারে বলতে হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু পড়া আর পরীক্ষা। এ দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় শিখানো হয় পরীক্ষার জন্য, নম্বর পাওয়ার জন্য। শিক্ষার্থীরা দিনে বিদ্যালয়ে বিকালে কোচিং আবার সন্ধ্যায় হোম টিউটর। এবার আপনারাই বলুন এমনভাবে শিক্ষার্থীর বিকাশ সাধন হয় নাকি ? সুস্থ দেহে সুস্থ মন কি তৈরি হয় ? আমরা যদি বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাই তাহলেই সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরির মাধ্যমে ঘটবে নব দিনের নব জাগরণ। শিক্ষার নামে চরম বিরক্তিপূর্ণ পরীক্ষামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছি।

যার অশেষ কল্যাণে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক বিকাশ হচ্ছে না, চিন্তার বিশুদ্ধতা অর্জিত হচ্ছে না। মেধার সঠিক বিকাশ ও চিন্তার বিশুদ্ধতার অভাবে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠছে আত্মকেন্দ্রিক মন মানসিকতার। তাদের কাছে শিক্ষা মানে পরীক্ষা কৃতকার্য হওয়া, বেশি মার্কস পাওয়া, কোচিং এ নিয়মিত যাওয়া, প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়া ইত্যাদি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যেভাবে পথ দেখানো হবে তারা সেই পথেই চলবে। এর জন্য আসলে কারা দায়ী ? এই জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্ষেত্রের নীতি নির্ধারকরা, শিক্ষক-অভিভাবক সমাজ। সময় বয়ে চলে সময়ের মতোই, আমাদের সময় এসেছে শিক্ষা নিয়ে ভাবার। শিক্ষায় নব জাগরণ আর কার্যকরী নব পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঠিকরূপে গড়ে তোলার জন্যে। শিক্ষা নিয়ন্ত্রক, শিক্ষার নীতি নির্ধারক, শিক্ষককূল, অভিভাবকমহলসহ সবাই মিলে ভাবতে হবে কিভাবে আমাদের শিক্ষায় নব সৃজন,নব জাগরণের নব ধারা সৃষ্টি হবে। নব সৃজন আর নব জাগরণের নব ধারায় হাতে হাত রেখে হবে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আমাদের জাতীয় উন্নয়ন।