বন্ধুত্ব আর কাঁচের দেয়াল 

প্রকাশিত: ৫:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০ 697 views
শেয়ার করুন
কৃষ্ণকলির একটা গান ‘বন্ধু আমার’ গানের কয়েকটি লাইন দিয়েই শুরু করি —বন্ধু আমার বন্ধু তুমি/বন্ধু মোরা কজন/তবুও বন্ধু মন হলো না আপন…’
গানে গানে বন্ধুর কথা – পৃথিবীতে সবাই  একা  আসে, একাই যায় তারপরও আপন পর নিয়েই চলে মনোসুখ কিংবা মনোবেদনা। কে আপন আর কে পর সেটা আজ অজানাই থাক, সময় বলে দেয় সবকিছু । ‘বন্ধু’ শব্দটি খুবই ছোট কিন্তু গভীরতা সাগর মহাসাগর অতলস্পর্শী আর ব্যাপ্তি আকাশ ছোঁয়া। বিশ্বাস আর নির্ভরতার প্রতীক বন্ধুত্ব। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটির নাম বন্ধুত্ব’ – গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের এই চিরসত্য কথাটির গভীরতা কতটা, তা তখনই উপলব্ধি করা যায় যখন জীবনে খুঁজে পাওয়া যায় একজন বন্ধু  যে মিশে যায়  অভিন্ন সত্ত্বায়। বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস, সম্মানবোধ  একে অন্যের  প্রতি, সহযোগিতায় বাড়িয়ে দেয়া প্রসারিত হাত ,পাশে থাকা, সুখে-দুঃখে ভেসে চলা একটা তরী।
  • জীবনের কোনো বাঁকে নয়,সময়ের গন্ডিতে বাঁধা নয় বরং দূরে থেকেও হৃদয়ে জায়গা করে নেয়াই যেন বন্ধুত্ব বন্ধন। ‘বন্ধুত্বকে পরিমাপ করা যায় না, করার দরকারও হয় না। কারণ বন্ধুত্ব হচ্ছে আঁধার রাতে আলোর প্রদীপ জ্বালানো। তবে যদি তা হয় সত্যিকার বন্ধু’। কথাটি নাট্যব্যক্তিত্ব শিমুল  ইউসুফের । বিশ্বায়নের এই যুগে সত্যিকার বন্ধু আর নিখাদ বন্ধুত্ব খুঁজে পাওয়াটা বেশ কঠিন। একজন প্রকৃত ভালো বন্ধু যেমন জীবনে উষার আলো ছড়াতে পারে, তেমনি স্বপ্ন আশার প্রদ্বীপ নেভাতেও পারে। বন্ধুত্ব নিয়ে  অনেক  কথা মজার প্রবাদ আছে ।ফরাসী প্রবাদে আছে যে- বন্ধুত্ব হলো তরমুজের মতো । ভালো একশটিকে পেতে হলে  এক কোটি  আগে পরিক্ষা করে দেখতে হয় । প্রবাদে না হয়  পরিক্ষার কথা বললো তাতে কি বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব মানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

বন্ধুত্ব নিয়ে সিসেরোর  উক্তি – ” কখনো কোন বন্ধুকে আঘাত করো না, এমনকি ঠাট্টা করেও না “। আমরা মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নই। ভুল করে অনেক মানুষকেই কষ্ট দেই, অপমান করি। সিনেকা বলে গিয়েছেন- যারা বন্ধুদের অপমান করে, বন্ধুদের অপমানিত হতে দেখে কাপুরুষের মতো নীরব থাকে তাদের সঙ্গে সংসর্গ করো না । দুই বন্ধু ও ভালুকের ওই গল্পটি নিশ্চয়ই সবারই  মনে আছে। ভালুককে আসতে দেখে এক বন্ধু উঠে গেল গাছে, দ্বিতীয় বন্ধুর কথা না ভেবেই! দ্বিতীয় বন্ধু বুদ্ধি করে শুয়ে রইল শ্বাস বন্ধ করে। ভালুক এসে ফিরে গেল তার নাক শুঁকে। প্রথম বন্ধু গাছ থেকে নেমে দ্বিতীয় বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভালুক তোকে কী বলে গেল রে?’ দ্বিতীয় বন্ধুর উত্তর, ‘বিপদেই বন্ধুর পরিচয়।’ গল্পটি পুরোনো, কিন্তু সত্যির জোরেই টিকে আছে এখনো।মার্কিন লেখক হেনরি অ্যাডামস বলেছিলেন, ‘বন্ধুরা জন্মায়, তৈরি হয় না।’ মানবশিশুর জন্ম হয় মাতৃভূমে আর বন্ধুত্বের জন্ম হয়  হৃদয় সত্ত্বায় ।  বন্ধুত্ব তিন ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হলো –
♢ খাবারের মত, যাদের  ছাড়া চলে না ।
♢ ঔষধের মত, যাদের মাঝে মাঝে দরকার হয় ।
♢ অসুখের মত, যাদের কেউ চায় না ।
আমি কিংবা আপনি চাইলে কারো ভালো বন্ধু হতো পারবো না আবার চাইলেই  ভালো বন্ধু পাওয়া যায় না । ইংরেজিতে কথা আছে, A friend in need is a friend indeed. বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। আজকাল সুযোগসন্ধানী বন্ধুর অভাব নেই পৃথিবীতে। সুযোগসন্ধানী বন্ধু তার স্বার্থ উদ্ধার হলেই সটকে পড়ে, এরা বন্ধু নয়, ছদ্মবেশী স্বার্থপর । বন্ধুত্বে তিনতিনটি প্রকার আছে। আমি হলাম  অসুখের মতো যাদের কেউ চায় না। যারা আমার বন্ধু তারা আমাকে ঠিকই জানে, বুঝে । শুধু আমি কেন সব বন্ধু  চাইবে না তার কোন বন্ধু স্বার্থপর মানুষের পাল্লায় পড়ে ডেকে আনুক সর্বনাশের পাগলা হাওয়া । যে সর্বনাশী হাওয়ায় ভেঙে পড়ে বন্ধুত্ব, গড়ে তোলে অভিমানের কাঁচের দেয়াল।