জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে
মোহাম্মদ কয়েছ আহমেদ মোহাম্মদ কয়েছ আহমেদ
বিয়ানীবাজার, সিলেট
প্রবাসীরা আমাদের কারো ভাই, কারো পিতা, কারো স্বজন, কারো নিকটআত্মীয়, কারো বন্ধু ও কারো শুভাকাঙ্খী।
আগে কিছু কথা আমার। আমি প্রবাসী । তবে ও আমি প্রবাসী পরিবারের সদস্য ও বটে। বহু সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার সমারোহে জীবনের এই বেলায় শত যন্ত্রণার গ্যাড়াকলে পিষ্ট হতে দেখেছি অনেক প্রবাসীর স্বপ্ন। জীবন সংগ্রামের এই সময়টাতে প্রতিটা মুহূর্তে কতোই না উচ্চাকাঙ্খা ও উচ্চ স্বপ্ন নিয়ে পথ চলে একজন প্রবাসী।
তারপরেও অনেক প্রবাসীর জীবন ডায়েরির পাতাগুলো শূন্যই থেকে যায় অথবা লেখা হয় না পাওয়ার যন্ত্রণার এক মহাকাব্য। সব আশা ভরসা হারিয়ে নিঃস্ব হয় কতো যুবক। সবকিছুর পরেও ওই প্রবাসীরাই আমাদের দেশের সম্পদ, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, আমাদের অহংকার ও গৌরবের প্রতীক।
দেশ ও জাতি। কিন্তু সেই পরামর্শ না দিয়ে ও অনেকেই অতি উৎসাহী হয়ে সেই সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসী ভাইদের মনে রয়ে যাবে নানা দুঃখ কথা। এ থেকে আমাদের সকলকে পরিত্রাণ পেতে হবে। প্রবাসী ভাইদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের আদরে রাখতে হবে।
আমি দেখেছি, অসহায়ত্বের জাঁতাকলে দুমড়ে-মুচড়ে যেতে মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অনেক প্রবাসীর স্বপ্ন। অকালে চলে যেতে দেখেছি অনেক যুবকের তাজা প্রাণ। সাগরপথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে সলিল সমাধি হয়েছে অনেক প্রবাসীর। অনেকেই প্রবাসে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের অনেক মৃত্যুর খবর পত্রিকার পাতায় ছেপেছি। যাদের বুকভরা স্বপ্ন ছিল একদিন তারা পরিবারকে টানাটানির সংসার থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেস্তে যায় সাগরের পানির ঢেউয়ের সাথে। দেশ ও পরিবারের সমৃদ্ধির জন্য সুদূর বিদেশের মাটিতে উপার্জন করেও তাদের মনে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে বেদনার নীল স্রোত।
সবাইকে সুখী রাখার প্রতিজ্ঞা নিয়ে যে ছেলেরা পাড়ি দিচ্ছে নিষ্ঠুর পৃথিবীর করুণার রঙ্গমঞ্চে, সেই প্রবাসীর না বলা কথাগুলো কেউ জানতে চায় না। কেউ জানার চেষ্টাও করে না।
প্রবাসীরা পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তিল তিল করে সব বিলিয়ে দেন অকাতরে। পরিবারের ওপর বিশ্বাস রেখে সবকিছু করে যান। জীবনের সব উপার্জন দিয়েও নিজের বা পরিবারের জন্য কোনো স্থায়ী সংস্থান করতে পারেন না ৯০ ভাগ প্রবাসী। প্রবাসের উপার্জন দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। পরিবারের স্বচ্ছলতাসহ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে নিজ মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটাতে হয় প্রবাসজীবন।
হয়তো একেই বলে এক ধরনের দেয়ালবিহীন কারাগার। প্রবাসে সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। সবার একই চিন্তা কিভাবে বেশি উপার্জন করা যায়। অনেক প্রবাসীরা প্রবাসে একটি রুমে কষ্ট করে পর্যায়ক্রমে রাত্রি যাপন করেন। অনেকে আছেন যারা ঘরে কোনোদিন এক গ্লাস পানিও হাতে নিয়ে খাননি। অথচও সেখানে গিয়ে রান্না করে কোনোমতে দিনযাপন করছেন। শুধু সংসার এবং দেশের দিকে চেয়ে।
মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের মান অভিমান পূরণ করতে গিয়ে তারা ভুলে যান নিজের শখ। আর প্রবাসীদের তার আপনজন বা প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-শুভাকাঙ্খিরা কষ্ট দিলে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। আমাদের দুটি চোখ একটুখানি সুখ দেখার জন্য অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। দুঃখ নিয়ে বিলাসিতা করার সুযোগ তাদের নেই।
তাদের দুঃখের কথা শুনুন এবং জেনে রাখুন যারা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই করে। যারা সুখের তরে সুখ হারায় ওদের কথা জেনে রাখা খুবই জরুরি কারণ ওদের ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল হলো দেশবাসী আপনজনের মুখের নির্মল হাসি।
সত্যি কথা বলতে কি, প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী ছাড়া আর কেউ বোঝে না। আমি এসব কেন লিখছি? কেন প্রবাসীদের প্রতি আমার এই দুর্বলতা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো আমি তাদের পরিবারের একজন সদস্য। প্রবাসী বৃহত্তর মানুষের যে চিন্তা চেতনা তা এগিয়ে নিয়ে যেতে মন চায়, তাই প্রবাসীদের লিখলে হল।


