কুষ্টিয়ায় বিশ্বকবির ৭৯তম প্রয়াণ দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুজন কুমার কর্মকার সুজন কুমার কর্মকার
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবসে, সুন্দরম ললিতকলা একাডেমি, কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বৃহস্পতিবার (৬ই আগষ্ট) রাত্রি সাড়ে ৮ টায় কুষ্টিয়া শহরের থানামোড়স্থ সুন্দরম ললিতকলা একাডেমিতে “অন্তরে অনুভবে তুমি” শিরোনামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব কনক চৌধুরীর সঞ্চালনা ও পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হয়।সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব আকাশ চক্রবর্তীর পরিকল্পনা ও তত্বাবধানে, অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী মৌসুমি বিশ্বাস, চন্দ্রীমা বসু দৃষ্টি, লামিয়া সুলতান পাবনি, এবং জুয়েল আহমেদ। আবৃত্তিতে ছিলেন আদ্রিতা আফরিন। সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব আকাশ চক্রবর্তী জানান, করোনা ভাইরাস এর কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে এবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবসে, “অন্তরে অনুভবে তুমি” শিরোনামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এদিকে ২২ শ্রাবণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯ তম প্রয়ান বার্ষিকী উপলক্ষে, কুষ্টিয়ায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন সংগঠন ভিডিও ইন্টারনেটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর আত্মপরিচয়। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সঙ্গীতস্রষ্টা, নট ও নাট্যকার। চিত্রকর, প্রাবন্ধিক, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তাঁর এ প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অর্জন।
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ জন্ম গ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ কর্মের মাধ্যমে সূচনা করে গেছেন একটি কালের। একটি সংস্কৃতির। কৈশোর পেরোনোর আগেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত বদলে দিতে শুরু করেন তিনি। তাঁর পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়েছে বাঙালীর শিল্প-সাহিত্য।
বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সঙ্কলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খন্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য- ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা।
রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদ ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তাঁর রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সঙ্গীত ভান্ডারকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আজকের বদলে যাওয়া সময়েও বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে টিকে আছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। এর আবেদন যেন কোনদিন ফুরোবার নয়। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণী ও সুরের ইন্দ্রজালে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে বাঙালী। তাঁদের আবেগ-অনুভূতি কবিগুরুর গানের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জাতীয় সঙ্গীতেরও রচয়িতা তিনি। বহু প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় সত্তর বছর বয়সে নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে অঙ্কিত তাঁর স্কেচ ও ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উৎসাহে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে। এরপর সমগ্র ইউরোপেই কবির একাধিক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। তাঁর আঁকা ছবিতে আধুনিক বিমূর্তধর্মিতাই বেশি প্রস্ফুটিত হয়েছে।
সমাজের কল্যাণেও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।


