শেষ বয়সে মমতা দি’র হারটা কষ্টের। আমি জানতাম নিদেনপক্ষে লোকটি মানুষের পক্ষে ছিলো (আমার জানায় ভুল থাকতে পারে হয় তো)। ধর্মের বেড়াজালে এমনি এমনি মানুষ খু*ন করার লোক জোড়াফুলের ঐ বেটি ছিলেন না। দেখলঅনেক অনধিকার শুরু চর্চা করে দিয়েছেন। বিরোধী মতের লোকদের বাংলাদেশি বলে গালাগাল করছেন। যা তা উগ্রামি করে বেরাচ্ছেন বিজেপির লোকেরা। আগুন দিচ্ছেন দেখেছি।
সীমান্তের এপাড়েও দেখেছি কট্টর হিন্দুত্ববাদী লোকের অভাব নেই। আমাকে একজন কিছুক্ষণ আগে বলে গেলেন, তার দল নাকি জিতেছে। ‘আমাদের দল জিতেছে’ বলে তিনি যে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন তাতে নাকে দুর্গন্ধ এসেছে। একটা লোক নিজ ধর্মের লোকের বাইরে অন্য কিছু ভাবতেই পারে না, মহান সংসদকে যিনি ধর্মশালা বানিয়ে রেখেছেন, অন্য ধর্মের প্রতি যার সামান্যতম সম্মানবোধ নেই এই লোকের দল জিতেছে বলে আমরা এতো আহ্লাদিত কেনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। আবার বলে, এবার তিস্তার পানি পাব। বলি কি, শুভেন্দু অধিকারী কি বিনে পয়সায় এবার পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবেন? এ আকাশকুসুম কল্পনাও কি আপনারা করেন? করতেই পারেন, এটা আপনাদের চিন্তার সংকীর্ণতা হতে পারে। শুধুমাত্র ধর্ম দিয়ে একজন মানুষকে বিবেচনা করলে আপনি অন্য কিছু হতে পারেন তবে মানুষ না।
মমতা দি’রও কিছু সমস্যা আছে। ওপারের এক দাদার সাথে কিছুদিন আগে মুঠোফোনে কথা বলেছিলাম ইলেকশান নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, এবার আর দিদি টিকবে না। খেলাটা সেদিনই বুঝেছিলাম। কেনো টিকবেন না জানতে চাইলে কত কথাই বললেন। সারমর্ম এই- তিনি লোকদের সম্মান করেন না, কড়া ভাষা কথা বলেন, গালাগাল করেন ও বিচার ব্যবস্থায় কিছুটা দলীয়করণ ইত্যাদি।
শুভেন্দু বাবু মুসলমান বিরোধী। সেটা বাংলাদেশ বলুন আর ভারত বলুন সবখানেই। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর একেবারে ফটোকপি। মুসলিম বিরোধী কথা বলে, ধর্মীয় বিষবাষ্প ছড়িয়ে অবশেষে তিনি বাংলা দখল করেই নিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হতে না হতেই শেখ হাসিনাকে নিয়েও তিনি জোর মন্তব্য করেছেন।
আমি মনে করি, তার এই বার্তা শুধু মাত্র তার কথা নয় ভারতীয় জনতা পার্টিরও একই চিন্তা। অন্যরা প্রকাশ করেন না, অধিকারী বাবু তা করেছেন বৈকি, বেশ আস্পর্ধার সহিতই করেছেন। থাক্, সে ইস্যুতে আজকের লেখায় যেতে নেই। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিজেপির দালালি করা রিপাবলিক বাংলা টিভি চ্যানেল কিন্তু ক্রমাগত তার কাজ করেই যাচ্ছে। বাংলাদেশেও অনেক চ্যানেল বা খবরের কাগজ কোনো কোনো দলের হয়ে গলাবাজি করে তবে এতো নগ্নভাবে করতে দেখিনি।
আমি দেখলাম, কিছুদিন হলো ভারত আমাদেরকে ভিসা দিতে শুরু করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেসব শুভারম্ভ করেছে এটিও তার একটি। কিন্তু আজ ফলাফলের মাধ্যমে রাজ্যের ‘নয়া’ মুখ্যমন্ত্রী বনে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারী যে রূপ দেখালেন তাতে কী আমাদের সম্পর্ক ঠিক থাকবে? আমার এই সন্দেহের পেচনে অনেকে বলতে পারেন, রাষ্ট্রীয় বিষয়ে রাজ্য সরকার কি সিদ্ধান্ত নিবে, সিদ্ধান্ত তো আসবে কেন্দ্রিয় সরকার থেকে। আমি বলি কি, যেহেতু শুভেন্দু বাবু মোদিজির জিরোক্স কপি সেহেতু তার বলা কথাও হয়তো হতে পারে রাষ্ট্র কথা।
আমরা বাংলাদেশি হিসেবে কখনোই নিজেদের স্বার্থ ছেড়ে কথা বলব না। মমতা বন্দোপাধ্যায় সব সময় নিজ রাজ্যের দোহাই দিয়ে তিস্তা চুক্তি করেননি। টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে নিজেদের সার্থে অনড় থেকেছেন। বলেছেন, রাজ্যের লাভে কাউকে ছাড় দেবো না। বাংলাদেশ আমার ভাই, তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক আছে থাকুক কিন্তু রাজ্যের স্বার্থ বিকিয়ে তো চুক্তি করতে পারবো না। বলি, যদি এখানে রাজ্যের স্বার্থই মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে তাহলে শুভেন্দু অধিকারী কোন স্বার্থে এ চুক্তিতে যাবেন। আর যদি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত স্বার্থে চুক্তি না হয়ে থাকে তাহলে আমরা আশা করতেই পারি পানি আমরা পাবো। এ ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতির অনেক যদি কিন্তু না আসে তাহলেই হলো আরকি।
বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমশ স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। সংসদে পক্ষে বিপক্ষে কথার তর্ক হচ্ছে। ওয়াকআউট হচ্ছে। ভেট্যু হচ্ছে। নানান উপমায় একে অন্যকে ইঙ্গিত করে কথার লড়াই হচ্ছে। জামায়াত এই মুহুর্তে বিএনপির শক্তিশালী বিরোধী বন্ধুর ভূমিকায় উপনীত হয়েছে। দেশের উন্নয়নে অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। খেলাধুলা, পাড়াশোনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারাকে পাকাপোক্ত করার পথেই হাঁটছে দেশের রাজনীতি। সংসদে সবাই দেশের উন্নয়নের কথা বলছেন। বিরোধীতা রাজপথ ছেড়ে সংসদে চলতে থাকুক। দাবি আদায়ের দাবি থাকুক। সবগুলোই রাজনৈতিক সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ। এমন সময়ে ভারতে ভোটের রাজনীতি বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি আমাদের জন্য অবশ্যই ‘কনসার্ন’র বিষয়। কারণ ভারত সরকার ভিসা দিয়েছে। আমরা এখন ভারতে যাবো। আমাদের যেতে হবে। চিকিৎসা, ব্যবসা, ভ্রমণ, পড়াশোনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জন্য আমাদের ভারত যেতেই হবে। তাদের ভিতরে যদি মুসলিস আর বাংলাদেশ বিদ্বেষী মনোভাব থাকে তাহলে অবশ্যই আমাদের উদ্বেগ থাকার কথা। ভিসা পেলাম, ভারতে গেলাম তারপর ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় মার খেয়ে, চড় থাপ্পড় খেয়ে দেশে এলাম এমনটা হলে তো দুই দেশের অবনমিত সম্পর্কের আর উন্নতি ঘটলো না। এ বিষয়টি আমার দেশের রাষ্ট্র প্রধানকে বা বিদেশ মন্ত্রককে ভাবতে হবে৷ না হলে খেলা নিয়ে ইন্টেরিমর যে নোংরামি কাঁচা রাজনীতি করে গেছে তা আবার মঞ্চায়ন হবে।
ছোটবেলা পড়েছিলাম গণতন্ত্রের উপকারি ও অপকারি দিক সম্পর্কে। একটা অপকারি দিকের কথা আজও মনে আছে। গণতন্ত্র অযোগ্যকে ভোটের দোহাই দিয়ে যোগ্য করে তুলে। পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এমনটাই ঘটেছে কি না সেটা বলবো না, সেটা প্রমাণ হবে শুভেন্দু অধিকারীর রাজ্য চালনা দেখে। যেহেতু ভারতী বাংলাবাসি শুভেন্দু বাবুর প্রতি আস্থা রেখেই ফেলেছেন সেখানে আমাদের মতো ছোট মানুষদের তো আর না করার জোঁ নেই। তাই ইচ্ছা অনিচ্ছার দিকে না তাকিয়ে নতুন এই মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখাই মঙ্গল হবে।
অভিনন্দন নরেদ্র দামোদর দাস মোদি, অভিনন্দন শুভেন্দু অধিকারী। শুভ কামনা সাদা শাড়ি ও জোড়াফুলের দিদিমনি।
লেখক: প্রভাষক ও সাংবাদিক