লোকজ ঐতিহ্যের কিংবদন্তি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০ 606 views
শেয়ার করুন

বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। কবিতার রাজ্যে নির্লিপ্ত পরিশুদ্ধতার কবি এবং পাঠকের কাছে অপ্রকাশিত তবে বর্তমানে তাঁর কাব্যসৃষ্টি চিরসবুজ একদম তরতাজা। তাঁর কবিতা বরাবরই কথা বলেছে আবহমান গ্রাম বাংলার মৌলিক রূপচিত্র। ইতিহাসে ফিরে তাকালে আজকের বাংলাদেশ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অর্ন্তগত। ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের সূর্য ডুবার উপলক্ষণ। অবিভক্ত ভারতে শুরু হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, মানুষজন মুক্তির প্রতীক্ষায়।

১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ বৃহস্পতিবার প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের বাবুগঞ্জের বাহেরচরের ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল জব্বার খান, পেশাগত জীবনে তিনি বিচারক ছিলেন, হাইকোর্টের জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ নেন এবং রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানের আইন পরিষদের স্পিকার হয়েছিলেন। মা সালেহা খাতুন একজন গৃহিনী। কবি শৈশবে তাঁর মাকে হারান, তখন তাঁর বাবা ২য় বিয়ে করেন। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ২য় মা কখনো বুঝতে দেননি তিনি যে তাঁর সৎ মা। এই মহৎ মায়ের মাতৃ¯েœহে বেড়ে ওঠেন তিনি ও তাঁর ভাইবোন। আট ভাই ও পাঁচ বোনের পরিবার।

সকল ভাইবোন ছিলেন অদম্য প্রতিভা ও মেধাশক্তির অধিকারী। ভাইদের মধ্যে অন্যতম হলেন নিউ এজ পত্রিকার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এনায়েত খান, বিশিষ্ট সাংবাদিক সাদেক খান, বামপন্থী রাজনীতির অগ্রজ প্রতিনিধি ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও ছোটভাই শহীদুল্লাহ খান বাদল । আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বোন সেলিমা রহমান ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ১৯৫৮ সালে মাহজাবীন খানকে বিয়ে করেন । সাফল্যে পরিপূর্ণ একটি সুন্দর পরিবার। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় পিতার কর্মস্থল ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে ১৯৪৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উর্ত্তীন হন। ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ হতে উচ্চমাধ্যমিক উর্ত্তীণ হন এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েছিলেন।

১৯৫৪ সালে তিনি অনার্সসহ এম.এ শ্রেণি উর্ত্তীণ হন। ১৯৫৮ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা কর্মটি সম্পাদন করেন। এখানে গবেষণারত থাকা অবস্থায় পরবর্তীকালে তিনি উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পারিবারিক আগ্রহের কারণে ঐ সময়ের বহুকাঙ্খিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন।

কর্মজীবনে তিনি সচিব পর্যায়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। অবসর গ্রহণ করার পর তিনি ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকারের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। এখানে থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন। ১৯৮৪ সালে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯১ সালে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যাংককস্থ কার্যালয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৭ সালে তিনি মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন।

এছাড়াও তিনি ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুসময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জীবনের নানা সময়ে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব করলেও কাব্যপথে তিনি ছিলেন অনবদ্য এক কবিপ্রতিভা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যসৃষ্টির সাথে আমার পরিচয় হয় আমার এক সহপাঠীর আবৃত্তির মাধ্যমে, সেদিন সে আবৃত্তি করেছিল কবির লেখা ‘কোন এক মাকে’ কবিতাটি। তাঁর কবিতার সূচনা হয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন প্রেক্ষাপটে এবং তাঁর কাব্যপ্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম রক্তঝরা আন্দেলন এবং মানুষের আশা-নিরাশা ও স্বপ্ন, বাস্তবতা, চিন্তার ভিন্নতাকেই কেন্দ্র করেই। ‘কোন এক মাকে’ কবিতাটি সৃষ্টির প্রেক্ষাপট হলো আমাদের ভাষা আন্দোলন।

১৯৫২ সালে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিকসহ আমজনতার আন্দোলন চরম আকার ধারণ করেছিল। তখন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের মিছিলে ১৪৪ ধারা জারি করে। বীর বাংলার সন্তানেরা অগ্নিঝরা সময়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করে। মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে এবং মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত প্রমুখ। ভাষা আন্দোলনের সময় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, একদম কাছ থেকে দেখেছেন শহীদ ছাত্রদের আত্মত্যাগ, প্রাণ বিসর্জন। বাংলার সাহসী সন্তানদের সেই আত্মত্যাগ ও বিসর্জনকে স্মরণীয় করে তুলতে, মানুষের বেদনার বহি:প্রকাশ এবং পাক পুলিশের হিংসতাকে ঘৃণা করেই রচনা করলেন অমর কবিতাশৈলি ‘কোন এক মাকে’ কবিতাটি।

কবিতার প্রতিটি অংশে জুড়ে দিয়েছেন সন্তানের জন্য মায়ের প্রতীক্ষা,ভালোবাসা আর ভাষা আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জনকারী সন্তানের রক্ত ঝরানো আবেগ। গ্রাম থেকে আসা এক তরুণ মারা যায় ভাষা আন্দোলনে, তাঁর মৃত্যুশোকই কবিতার মূল উপজীব্য বিষয়। একদম সহজ সরল উপস্থাপনা, রূপকল্পে স্বরবৃত্তের এক প্রকৃষ্ট বন্ধন। কাব্যধারায় নেই বিরক্তময় বাড়তি কথন, নেই কোন অযথা কাব্যটান। সহজ সরল ভঙ্গিমায় তুলে ধরেছেন গ্রাম বাংলার প্রতিটি মায়ের হৃদয়ের ভিতর সঞ্চিত অনুভূতিকে। প্রকৃতির সুরম্য দৃশ্যের বর্ণনা, খোকার পছন্দের নারিকেলের চিড়ে, উড়কি ধানের মুড়কি, বিন্নি ধানের খইসহ কতকিছুর প্রাণবন্ত উপস্থাপন করেছেন হৃদয় নিংড়ানো আবেগে।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ সাতনরী হার, আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, কমলের চোখ, প্রেমের কবিতা, বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা,মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ, সহিঞ্চু প্রতীক্ষা, কখনো রং কখনো সুর ইত্যাদি। ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কাব্যগ্রন্থটি কবিকে দিয়েছে এক অবিনশ্বর পরিচয়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ পড়ে নাগরিক কবি শামসুর রহমান নিঃসংকোচে বলেছিলেন, “তিনি যদি আর কোন কবিতা নাও লিখেন তবুও তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন শক্তিশালী কবি হিসেবে”। এই বিখ্যাত কালজয়ী গ্রন্থটি পাঠ করে জীবনানন্দ উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায় বলেছিলেন “ মন্ত্রের মতো অমোঘ উচ্চারণ। এমন কবিতা বাংলা ভাষায় লেখা যায় আমার জানা ছিল না।” আসলেই আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সাহিত্যরস ও কাব্যসৃষ্টি তাঁকে দিয়েছে যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে সাহিত্য প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে থাকার একসমুদ্র সফেন নরম শীতল অথচ অবিচল অক্ষত অবস্থান। সাহিত্যকর্মে অবদান রাখার জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ, সোমবার ঢাকায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকরা বেঁচে আছেন তাঁদের কালজয়ী সৃষ্টির জন্য। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ কালের স্মৃতিস্তম্ভের মাঝে বেঁচে আছেন তাঁর অসাধারণ কাব্যপ্রতিভায় ‘কোন এক মাকে’ কিংবা ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কাব্যরেখার ‘সহিঞ্চু প্রতীক্ষায়’।

লেখকঃ সাহিত্য সমালোচক