চুনারুঘাটে ফসলি জমি ও গ্রাম থেকে বালু উত্তোলন 

নুর উদ্দিন সুমন নুর উদ্দিন সুমন

হবিগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২০ 694 views
শেয়ার করুন

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুরী ইউনিয়নের দারাগাও পুরো গ্রামটি বালু উত্তোলনে তছনছ হয়ে গেছে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাচ্ছেন গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষ। ভেঙ্গে পড়েছে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ লাইন, কবরস্থান ও শ্বশানঘাট। প্রায় অর্ধশতাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলনে হুমকির মুখে পড়েছে গ্রামের মসজিদ, মক্তব, স্কুল ও মাদ্রাসা। ইতিমধ্যে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে অন্যত্র। গ্রামের যুবকরা অবৈধভাবে এসব বালু উত্তোলনে বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাদের হুমকি দিচ্ছে বালুখেকোরা। মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ জন বালূখেকোর কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী দাারাগাও গ্রামটি। গ্রামবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত রবিবার সহকারি কমিশানর (ভুমি) মিল্টন চন্দ্র পালের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত এ গ্রামে অভিযান চালিয়ে ২৬টি ড্রেজার মেশিন এবং প্রায় ৫ হাজার ফুট পাইপ জব্দ ও ভেঙ্গে নষ্ট করেন। এসময় বালু উত্তোলনের সময় দুজনকে আটক করে একজনকে ১ বছর ও অপরজনকে ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।

গ্রামের যুবকরা জানায়, চুনারুঘাট উপজেলার দারাগাও গ্রামের যুবলীগ নেতা মশ্বব আলী কাউছারের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি দল গ্রামে বালু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তাদের শেল্টার দিচ্ছে পাশ্ববর্তী বাহুবলের জয়পুর গ্রামের ফারুক মিয়া, কবির মিয়া, আলআমিন, প্রদীব দেব, মাসুক মিয়াসহ ৮/১০ জনের একটি চক্র। এ চক্রটি গ্রামের ৩০/৩৫ জনের কাছ থেকে জমি কিনে বড় বড় ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে এবং ট্রাক, ট্রাক্টর ও ১২ চাকার গাড়ি দিয়ে বালু পরিবহন করে কামাইছড়া এলাকার ডিপোতে নিয়ে সেখান থেকে বিক্রি করে। বালু বিক্রি করে তারা কোটিপতি হলেও গ্রামের মানুষ হচ্ছে নি:স্ব। তার মধ্যে গ্রামে বালু সিন্ডিকেটের সদস্যদের অনেকেই এখন চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল ও মিরপুর এলাকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি করে বসবাস করছেন। গ্রামে তারা যান শুধু বালু ব্যবসার জন্য। অথচ গ্রামের মানুষ তাদের ফসলি জমি থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করার কারণে বসতভিটা হারাচ্ছেন। ভাঙ্গছে তাদের কবরস্থান, শ্বশানঘাট, মসজিদ, মক্তব, স্কুল ও মাদ্রাসা। রাস্তাঘাটের অবস্থা তো আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। গ্রামে যাওয়ার রাস্তাগুলো এখন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেছে। গ্রামের কোন গর্ভবর্তী মহিলা কিংবা রোগীকে এখন আর হাসপাতালে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বড় বড় গর্ত করে বালূ উত্তোলনের কারণে মানুষের বসতভিটা ভেঙ্গে পড়ছে এবং অসংখ্য ঘর ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। ফসলি জমিতে বালুতে ভরে যাওয়ায় তাদের ধান গাছ বাড়ছে না। চিন্তায় আছেন কৃষকরা আগামী দিনে তারা কি খাবেন। কারণ ধান না হলে তাদের না খেয়ে মরতে হবে। গ্রামের দরিদ্র কৃষকরা এখন এক চরম বিপদে আবর্তিত হচ্ছেন। তারা ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। প্রভাবশালী মহলটি তাদের জমির উপর দিয়ে জোরপুর্বক বালু উত্তোলনের পাইপ নিয়ে গেছেন। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাদের মারধোর করা হচ্ছে, হুমকি দেওয়া হচ্ছে। স্কুল কলেজ ও মাদ্রসাগামী শিক্ষার্থীরা রয়েছেন চরম আতংকে। প্রতিদিনি আড়াই থেকে ৩শ ট্রাক, ট্রাক্টর দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে বালু। এতে রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাচ্ছে। পাশাপাশি দরিদ্র লোকজন যারা এলাকায় টমটম, রিক্সা চালিয়ে জীবণ ধারণ করেন তারাও রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। ট্রাক্টর ও আর ট্রাকের কারণে তারা যান চালাতে পারছেন না। এ নিয়ে বালু খেকোদের সাথে তাদের প্রায়ই দেন দরবার ও হাতাহাতি হচ্ছে।
গ্রামের সিন্ডিকেট সদস্যরা তাদের জমি বালু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। বালূ খেকোরা প্রত্যেকে ৮/১০টি ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে জমি থেকে বালু উত্তোলন করছেন। এভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বড় বড় গর্ত তৈরী হচ্ছে এবং এসব গর্ত থেকে পুনরায় বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙ্গছে ফসলি জমি ও বসতঘর। এসব বালু আবার ফসলি জমিতে ডিপো করে পরিবহন ও লোডআনলোড করার কারণে ফসলি জমিও নষ্ট হচ্ছে। কামাইছড়া থেকে দারাগাও পর্যন্ত ৫টি ব্রীজ রয়েছে চরম হুমকিতে। যে কোন সময় এসব ব্রীজ ভেঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। বিচ্ছিন্ন হতে পারে ফিনলে টি কোম্পানীর চা পরিবহন ও যাতায়াত। একই ভাবে বালু পরিবহন ও উত্তোলনের কারণে হুমকির মধ্যে রয়েছে দারাগাও চা বাগান। প্রতিবন্ধি আকছির মিয়া জানান, আমার ভাই কাদির মিয়ার ৪০ শতক জমি বালুতে ভরে গেছে, কোন ধান হয়না। এর প্রতিবাদ করলেই তারা দা, লাটি পিকল নিয়া আমাদের উপর হামলা চালায়। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারিনা। গ্রামের তরুণ যুবক সিফু খান বলেন, গ্রামের কৃষি জমিতে বড় বড় গর্ত করে ৭০টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী মহল। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাদেরকে চাদাবাজি মামলা দেওয়ার হুমকি দেয়। তিনি বলেন, গ্রামের কৃষকরা দিনে দিনে নি:স্ব হয়ে যাচ্ছে, গ্রামের শত শত একর জমি এখন গর্তে পরিনত হয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে রাস্তাঘাট, স্কুল মাদ্রাসা এখন হুমকির মুখে। দরিদ্র হাছেনা খাতুন বলেন, কদিন পরই আমার ঘর ভেঙ্গে যাবে, আমার স্বামী নাই, আমি তখন ৩টা বাচ্ছা নিয়ে কোথায় যাব এ চিন্তায় আছি। এবিষয়ে সাটিয়াজুরী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ বলেন, দারাগাও গ্রামে বালু খেকোরা হরিলুট চালাচ্ছে, সকল দলের লোকজন মিলেই গ্রামে বালু উত্তোলন করছে, গ্রামের বাড়িঘরে প্রতি তাদের কোন দরদ নেই। তিনি এ বিষয়ে উপজেলা সভায় বার বার অবগত করছেন বলেও জানান। তিনি বলেন গ্রামবাসীকে এ বিষয়ে সচেতন না হলে ভয়াবহ পরিনতি হবে।
সহকারি কমিশনার (ভুমি) মিল্টন চন্দ্র পাল বলেন, অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহনকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিদিনই ভ্রাম্যমান আদালতে জরিমানা, মেশিন ও পাইপ পুড়িয়ে দেওয়া এবং আটক অভিযান চলছে। দাারাগাও গ্রামের বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যজিত রায় দাশ বলেন, সরকারে নিয়মের বাইরে জমি থেকে এবং অবৈধ ভাবে যে কেউ বালু উত্তোলন করলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা এবিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনে যাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা গ্রামের সংঘাতের বিষয়টি জেনে ব্যবস্থা গ্রহন করেছি।