কুষ্টিয়ায় খামারিদের জন্য অনলাইন বাজার চালু করেছে জেলা প্রশাসন
সুজন কুমার কর্মকার সুজন কুমার কর্মকার
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ায় খামারিদের জন্য অনলাইন বাজার চালু করেছে জেলা প্রশাসন। সেখানে জেলার প্রায় ৪০ হাজার খামারির নাম ও ঠিকানা রয়েছে। অনেকে তাদের পশুর ছবিসহ দাম উল্লেখ করে দিচ্ছেন।
এদিকে দেশে করোনার এই পরিস্থিতি, খামারিরা লাভের আশাতো দুরে থাক বাজারে নিয়ে গরু বিক্রি করে আসল তুলতে পারবেন কি-না এটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়বা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের খামারি হান্নান মোল্লা। সারা বছর বাড়িতে কমবেশি গরু পালন করেন। ঈদ সামনে লাভের আশায় গরুর সংখ্যা বাড়ান। এবারো তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬টি গরু রয়েছে। দিন-রাত গরু পরিচর্যায় সময় পার করছেন। তবে ঈত যত এগিয়ে আসছে তার চিন্তা তত বাড়ছে। হান্নানের মত বেশির ভাগ খামারিরা গরু বিক্রি করা নিয়ে এখন থেকে নানা চিন্তা শুরু করেছেন।
তবে কম লাভ হলেও অনেক খামারি স্থাণীয় বাজারে আগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর যারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্য জেলায় বিক্রি করেন তারা অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য।
জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর জেলায় ছোট, বড় খামারে সব মিলিয়ে ৯০ হাজারে কাছে গরু পালন করা হয়েছিল। খামারিরা লাভও পেয়েছিলেন। এবার জেলায় প্রায় ১ লক্ষের কাছাকাছি গরু পালন করছেন খামারিরা। গত বারের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার বেশি।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ সিদ্দীকুর রহমান বলেন,‘ জেলায় এবার প্রচুর গরু পালন করছেন খামারিরা। তবে ঈদ এগিয়ে আসায় তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলার সব খামার মালিকরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে গরু নিয়ে লাভ করতেন তারা এবার ক্ষতির মুখে পড়ে যেতে পারেন। কারন জীবন আগে পরে জীবিকা। এই অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে গরুর বাজার। স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা হলেও বাইরে থেকে ব্যাপারীরা এবার আসছেন দেখে চিন্তা বেড়েছে খামারিদের।
তিনি বলেন,‘ আমরা খামারিদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছি। তাদের নানা ধরনের প্রনোদনা দিয়ে আসছি।’
আইলচারা এলাকার খামারি আলমগীর হোসেন ও হামযারুল ইসলাম বলেন,‘ তারা সারা বছর কুরবানীর ঈদের আশায় থাকেন। এ জন্য খামারে বড় বড় গরু পালছেন। তবে এবার আমরা আশাহত। অন্যান্য বছর বাইরে থেকে ব্যাপারী আসে, ভাল দামে বাড়ির ওপর থেকে গরু বিক্রি হয়ে যায়। করোনার কারনে এবার ফোনে দু’একজন যোগাযোগ করলেও আসছেন না। এসব গরু নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন। আমরা জানতে পেরেছি এবার কুরবানীর সংখ্যা অনেক কম হবে। এ অবস্থায় অনলাইনে বিক্রির চেষ্টা করছি। অনলাইনে ছবি দিয়ে দিয়েছে। অনেকেই যোগযোগ করছেন।’
খামার মালিক হান্নান মোল্লা বলেন,‘ গত বছর গরু বিক্রি করে মোটামুটি লাভ হয়েছিল। তাই এবারো গরু পালছি। করোনার কারনে এবার লাভতো দুরে থাক আসল দাম তুলতে পারলেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। গো-খাদ্যের যে দাম বেড়েছে তাতে এবার লোকসান হবে বলে মনে হচ্ছে। অন্য বছর আগেই ব্যাপারিরা বাড়ির ওপর আসতো। এবার কেউ আসছে না। দু’একজন আসলেও দাম বলছেন অনেক কম।
উপজেলার সদকী ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের খামার মালিক সোহেল রানা জানান,গত বছর সাত লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। এতটাকা বিনিয়োগ করে যদি ভালো দাম না পাই তাহলে খামারিদের দুঃখের সীমা থাকবে না। করোনার কারনে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তিনি। তাই বাড়ির ওপর থেকে বা স্থানীয় ভাবে কম লাভ হলেও গরু ছেড়ে দিবেন বলে জানান। তার খামারে ৫টির মত বড় গরু রয়েছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আলামপুরসহ কয়েকটি উপজেলা বড় গরুর হাট বসে। করোনার পরিস্থিতির মধ্যে হাটগুলো বসছে। বাজারে প্রচুর গরু উঠছে। তবে গত বারের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে বড় গরুর চাহিদা এবার নেই বললেই চলে। মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর বিক্রি বেশি হচ্ছে বলে জানালেন ব্যাপারি সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন,‘ অন্যান্য বছর আমরা চাহিদা মত গরু আগে থেকে কিনে রাখতাম। এবার গরু কিনছি না। দু’একজন আছেন যারা কিছু অর্ডারের গরু কিনছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আছেন যারা আগেই গরু কিনে রাখতেন। এবার তারাও খুব একটা অর্ডার দিচ্ছেন না। গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা অনেক কম।
আজাহার আলী নামের একজন গরু ব্যবসায়ী বলেন,‘ গরুর বাজার কম। কুরবানীর আগে দাম বাড়বে বলে মনে হয় না। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই কুরবানীর সংখ্যা এবার কম হবে। বেশির ভাগ প্রান্তিক খামারি এবার লোকসানে পড়বেন। অনেকেই গরু বিক্রি করতে পারবেন না। যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ পাবেন কম।’
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকার বড় খামার মালিক হাজি ওমর ফারুক। আলামপুর ইউনিয়নের স্বর্গপুর এলাকায় তার খামারটির অবস্থান। সমন্বিত এ খামারে এবার তার ১০০টির ওপর গরু রয়েছে। তবে এ গরু বিক্রি নিয়ে তার টেনশন বাড়ছে। জেলার অন্যতম শীর্ষ এ চালকল মালিক আগে ভাগেই তার পরিচিত মিল মালিকদের কাছে এসব গরু বিক্রি করে দিতেন। তবে এবার সুর নরম। গরুর বাজার অনেক কম, আর বিক্রিতে সাড়া নেই। তারপরও তিনি খামার থেকে ৩০টির মত গরু বিক্রি করে দিয়েছেন।
সদর উপজেলার আরেক বড় খামারি উজানগ্রাম ইউনিয়নের সোনাইডাঙ্গা গ্রামের শরিফ হোসেন। তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬০টি গরু রয়েছে। এ গরুর অর্ধেক বিক্রি করা নিয়ে তার টেনশন। লাভ নিয়ে ভাবছেন না। গরু বিক্রি করতে পাললেই তিন খুশি। কারণ খামারে গরু থেকে গেলে প্রতিদিন তার পিছনে ব্যায় আছে। তাতে লোকসান আরো বাড়বে। তাই খামার খালি করা নিয়েই ভাবছেন তিনি।
জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস মনে করছেন এবার ৫০ ভাগ গরু অবিক্রিত থাকতে পারে। আর যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ করতে পারবেন না খুব একটা। এতে খামারিরা বড় লোকসানে পড়ে যাবেন। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই আগামী কয়েক বছর লোকসানে থাকবেন। কারণ যারা গো-খাদ্য বিক্রি করেন তারাও কুরবানীর জন্য অপেক্ষা করেন। গরু বিক্রি দেনা শোধ করেন অনেকে। তাই তাদের বড় অর্থ খামারিদের কাছে পাওনা থেকে যাবে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন বলেন,‘ খামারিদের পাশে আমরা সব সময় আছি। তাদের কথা বিবেচনা করে অনলাইন বাজার চালু করেছি। সেখানে খাামরিদের তথ্য আছে। ব্যাপারীদের সাথে খামারিদের যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার জন্য এ অনলাইন হাট চালু করা হয়েছে। ভাল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আশা করছি খামারিরা শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত দামে তাদের পশু বিক্রি করতে পারবেন।
________________
সুজন কুমার কর্মকার
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি


