চট্টগ্রামে করোনামুক্ত ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা প্লাজমা দিতে প্রস্তত

কাউছার আলম কাউছার আলম

পটিয়া, দক্ষিণ চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০ 1,581 views
শেয়ার করুন

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতেই মানুষকে সচেতনসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ছাড়া ও উপজেলার কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা কোথাও অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছেন রাত বিরাতেও। এভাবে পেশাকে ভালোবেসে সারাক্ষণ কাজে নিজেকে সঁপে দিয়ে ছিলেন সোমেন বড়ুয়া। একপর্যায়ে তিনিই আক্রান্ত হন করোনায়। তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার সোমেন বড়ুয়া। দুই দফায় পরীক্ষার পর নেগেটিভ হওয়ায় পটিয়া হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়াড হতে ২৯ জুন বুধবার ছাড়পত্রসহ অভিনন্দন দেয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা।

 

করোনায় আক্রান্তের পর তিনি ছোট্ট শিশুকে বাসায় আলাদা রুমে রেখে চলে যান অন্য একটা আলাদা রুমে। তখন শিশুটি পুরোপুারি নির্ভরশীল মায়ের ওপর। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা তাকে মেনে নিতে হয়। পাশের রুম থেকে শিশু সন্তানের কান্না তাকে অস্তির করে তোলে। কেবল চোখের পানি ছেড়ে অসহায়বোধ করতে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না তার। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলেন। এভাবে কেটে যায় কয়েকদিন। সন্তানকে ভয় দেখালে ছুটে আসতে চায় বাবার কাছে। কিন্তু জগদ্দল পাথর বুকে চেপে ধরে মানসিক শক্তি পেতে থাকেন। শুরু হয় করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ । এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে ছুটে যান পটিয়া হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়াডে। সেখানে টানা কয়েকদিন চিকিৎসা সেবা শেষে ২৯ জুন জয়ী হয়ে বের হয়ে আসেন বাসায় । অনেক দিন পর শিশুকে বুকে তুলে নেন নাড়ি ছেড়া ধন দুগ্ধপোষ্য শিশু কন্যা সৌমিত্রা কে । জানালেন আজকে তার যুদ্ধ জয়ীর কথা।

করোনা জয়ী সোমেন বড়ুয়া জানান, করোনার দুঃসময়ে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও সর্বক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করতে কাজ শুরু করেন তিনিসহ পুরো স্টেশনের সবাই । এর মধ্যে গত ১০ জুন নিজেই অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। জ্বর, কাশিসহ শরীরে ব্যাথা অনুভব করতে থাকেন। বাসায় আলাদা রুমে থেকেই চিকিৎসা ধীন ছিলাম। কিন্তু ২৫ জুন শরীরের অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়ায় ডাঃ রাজীব দে দাদার পরামর্শে পটিয়া উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হই।

এর আগে ১৫ জুন নমুনা দিই। রেজাল্ট আসে পজিটিভ ১৯ জুন । পরদিন পরিবাররহতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যরা ছাড়া প্রশাসনের অনেকেই পরীক্ষা করান। তিনি বলেন, আমার করোনা পজিটিভ আসার পর বাসায় থেকেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। বাসার একটি কক্ষে আসোলেশনে চলে যান। শিশু সন্তানকে মা’র কাছে। এক রুমে থাকলেও দূরত্ব বজায় রাখতাম। আমাদের প্লেট, গ্লাসসহ সবকিছুই ছিল আলাদা। তবে প্রথম কয়েকদিন আমাদের খুবই কষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ‘নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে ২ জুলাই। নমুনা দিয়েছিলাম ২৮ জুন দ্বিতীয়বারের মতো । আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শে আরও কিছুদিন হোম আইসোলেশনে থাকবো।

সবাই জানেন যে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একটি জরুরী সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ জরুরী সেবা(অগ্নি নির্বাপন ও বিভিন্ন দুঘটনায় উদ্ধার কার্যক্রম) প্রদানের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন এর সাথে সমন্বয় করে করোনা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছিল। স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী আমরা জীবাণুনাশক পানি ছিটানোর কার্যক্রম ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসন কতৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্টে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছিলাম।

আর্ত মানবতার সেবায় নিয়োজিত বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এই করোনা কালীন সময়েও দুর্গত মানুষকে সেবা দিতে বদ্ধপরিকর। ফায়ার সার্ভিসের মাননীয় মহাপরিচালক এবং সম্মানিত পরিচালকবৃন্দ দেশের এই করোনা দুর্যোগ কালীন সময়ের শুরু থেকেই জরুরী সেবার পাশাপাশি নিজেদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখার জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন। পিপিই ও সরবরাহ করা হয়েছে। আমরা নিয়ম মেনে সেসব পিপিই পড়ে সেবা দিতে যাই।

তবে অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধার কাজ করার সময় আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও জনসাধারণ সচেতন না হওয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আবার, উদ্ধারের সময় যাদেরকে উদ্ধার করি, তাদের কাছে না গিয়ে কোন উপায় থাকেনা। পটিয়া একটি বড় উপজেলা, ১৭ টি ইউনিয়ন ও ০১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় প্রতিনিয়ত বিভিন্নরকম দুর্যোগ হানা দেয়। আমাদের প্রায় প্রতিদিন একাধিক দুর্যোগে কাজ করতে হয়। এ ধরনের কোন একটা দুর্যোগে কাজ করতে গিয়েই আমি আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। বিশেষ করে আমার জ্বর আসার কয়েকদিন আগে আমরা একটি ট্রাক এক্সিডেন্টে খুব বাজেভাবে আটকেপরা একজনকে উদ্ধার করি, যার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে।

যাই হোক, মহান প্রভুর অশেষ কৃপায় ১৮ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছি। আমার সুস্থ উঠার পিছনে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স, বিশেষ করে আমাদের ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান অপরিসীম। আমি সকলের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

পুনরায় নিজের কাজে যোগদান করতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি মানুষের সেবায় আরো বেশি কাজ করতে চাই। এবং শারীরিক দুর্বলতা কেটে যাওয়ার পর আমি গুরুতর অসুস্থদের সেবায় প্লাজমা দিতে আগ্রহী। ১৮ দিনের অফিসিয়াল কোয়ারান্টাইন ও আইসোলেশন পিরিয়ড শেষ করে সবার মাঝে ফিরে আসতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি, এবং এই সৌভাগ্য আমি অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চাই।

সোমেন বড়ুয়া জানান, করোনা আক্রান্ত হলেও তার শরীরে জ্বর ছাড়া তেমন কোনো উপসর্গ ছিল না। ১৪ দিন পর দ্বিতীয় নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।

তিনি বলেন, ‘নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। বাসায় থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলে সুস্থ হয়েছি। আমার রক্তের গ্রুপ বি পজিটিভ। আমি করোনা আক্রান্ত রোগীকে প্লাজমা দিতে চাই।’

করোনা চিকিৎসা খাবার প্রসঙ্গে সোমেন বড়ুয়া জানান, প্রেটিন ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খেয়েছেন। সেই সঙ্গে পানির সঙ্গে আদা, কালো জিরা, মধু, রসুন ও লবন দিয়ে গরম করে পান করেছেন। এ ছাড়া সব সময় গরম পানির ভাপ নিতেন ও পান করতেন। মনোবলটা ছিল অত্যন্ত শক্ত ছিল।

করোনা চিকিৎসা খাবার প্রসঙ্গে সোমেন বড়ুয়া জানান, প্রেটিন ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খেয়েছেন। সেই সঙ্গে পানির সঙ্গে আদা, কালো জিরা, মধু, রসুন ও লবন দিয়ে গরম করে পান করেছেন। এ ছাড়া সব সময় গরম পানির ভাপ নিতেন ও পান করতেন। মনোবলটা ছিল অত্যন্ত শক্ত ছিল। তিনি এখন প্রস্তুত আক্রান্ত রোগীদের বাঁচাতে নিজের প্লাজমা দেওয়ার জন্য। তার রক্তের গ্রুপ এবি পজিটিভ।