হত্যাকাণ্ড ঘটার একদিন পর রবিবার বিকালে এই প্রতিবেদক যান নিহত দিলোয়ারের ভাইয়ের বাড়ি কামরুপদলং-এর কান্দি গ্রামে। বর্তমানে ছোটভাই সেলিমের ঘরে বসবাস করছেন নিহতের সন্তানরা। কথা হয় নিহতের মা-বাবা, তিন সন্তান ও বড় ভাই আলী হোসেনের সাথে। পরিবারের লোকজন জানান, স্ত্রী চলে যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো দিলোয়ার হোসেনকে। ছেলেটি খুবই অসুস্থ ছিলো বলে তাকে সব সময় চিকিৎসাধীন রাখতে হয়েছে। পরিবারের একজন না একজনের কোনো না কোনো সমস্যা থেকেই যেতো। এজন্য অনেকদিন ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও কাজে যেতে পারেন নি দিলোয়ার। আয়ের কোনো পথ না থাকায় এক সময় নিজের শেষ সম্বল বসতভিটা বিক্রি করে দেন তিনি। প্রায় আট মাস আগে আশ্রিত হয়ে চলে যান সদরপুর গ্রামের মোস্তার আলী ওরফে মোস্তাই মিয়ার বাড়িতে। সেখানেই তিন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। ভিটেমাটিহীন দিলোয়ার একজন দিনমজুর হলেও এলাকায় একজন ভালো মানুষ ছিলেন বলে জানিয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ।
বড় মেয়ে নাদিয়া বলেন, আব্বা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সানোয়ারকে (ছোট ভাই) নিয়ে সদরপুর পয়েন্টে যেতেন। সেখান থেকে মিঠাই (শিশু খাদ্য) কিনে দিতেন, সে খুশি হয়ে বাড়ি ফিরতো। ঘটনার দিন ভোরে সে আব্বাকে খুঁজে পয়েন্টে গিয়েছিলো কিন্তু পায়নি, খালি হাতে ফিরে এসেছে। আর কোনো দিন সে পয়েন্টে গিয়ে আব্বাকে খুঁজে পাবে না। এই বলে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই বলতে লাগলেন, আমার আব্বার স্বপ্ন ছিলো আমার ভাইকে কুরআনে হাফিজ বানাবেন। মাদ্রাসায় পড়িয়ে আলেম বানাবেন। তিনি চাইতেন তার ছেলে যেনো বাবার জানাজার নামাজ পড়ায়। কিন্তু আমার ভাই সে সুযোগ পায়নি। এখন সে এমদাদুল উলুম কামরুপদলং মাদ্রাসায় নূরানী শ্রেণিতে পড়ে।
আপনি কোন ক্লাসে পড়ছেন?
আমি এখন পড়ি না। মা চলে যাওয়ার পড়ে দাদীর সাথে ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা করতে হয়েছে বলে আর মাদ্রাসায় পড়া হয়নি। আব্বা অনেক সময় আমাদের সবাইকে একসাথে জড়ো করে কাঁন্না করতেন। তরিতরকারি ভালো কিছু না হলে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইতেন। বলেতেন, ‘মা গো, আমার উপর রাগ করো না। আমি তোমাদের ভালোমন্দ কিচ্ছু খাওয়াতে পারি না। সব সময় কাজ মিলে না।’ আমি তখন বলতাম, আব্বা বড় হলে বিদেশে চলে যাবো। তোমার তখন আর কোনো দুঃখ থাকবে না। আব্বা রাগ করতেন। বলতেন, ‘আমি ভিক্ষা করে তোদের খাওয়াবো, তবু তোকে বিদেশ যেতে দেবো না।’ মাঝে মাঝে আম্মার জন্য কান্না করতাম। বাবা বলতেন, আমিই তোদের মা-বাবা। সেদিন আর কাজে যেতেন না।
আপনার বাবা আপনাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন?
উত্তরে নাদিয়া বলেন, আব্বা আমাদের নিয়ে তেমন স্বপ্ন বড় দেখতেন না। তিনি চাইতেন সানোয়ার হাফিজ হোক আর আমাদের নিজেদের একটা ঘর হোক। আমার আব্বার একটা স্বপ্নও বাস্তবায়ন হতে দেয়নি পিশাচের বাচ্ছারা। কীভাবে আমাদের সামন থেকে আমাদের আব্বারে তুলে নিয়ে গেলো (আবারও কান্না)? এখন আমার আব্বার স্বপ্ন আমি বাস্তবায়ন করতে চাই। বাড়ি হোক কিংবা না হোক আমার ভাইকে কুরআনে হাফিজ করতে চাই। আর যারা আমার আব্বাকে খুন করেছে তাদের ফাঁসি চাই। আমার আর কোনো চাওয়া নাই। তোমাদের মা এখন কোথায় আছে জানতে চাইলে মেয়ে জানান, আমাদের সাথেই আছেন।
ছেলে হত্যার বিচার চান নব্বই-ঊর্ধ্ব বাবা লিম্বর আলী ও সত্তরোর্ধ মা খতিজা বেগম। তাঁরা বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। খুনের বদলা ফাঁসি চাই। ছেলের কাঁদে বাবার লাশ যে কত বড় বোঝা তা সেই বুঝে, যে এই বোঝা বহন করেছে।
দিলোয়ার হোসেন বেশি চলাফেরা করতেন একই গ্রামের বাসিন্দা ইসরাইল মিয়ার সাথে। ইসরাইল মিয়া, নওয়াব আলী ও ইসমাইল আলী বলেন, দিলোয়ার মানুষ হিসেবে খুবই ভালো ছিলো। সে কখনোই কোনো ঝগড়াঝাটিতে ছিলেন না। কৃষিকাজ করত। দিন মজুরি করেই দিন কাটতো তার। কোনো দলাদলিতেও ছিলো না। তার ছেলে-মেয়েগুলো অসহায় হয়ে গেলো। তার সন্তানগুলোর বিভিন্ন সহযোগিতার দরকার। মোস্তাই মিয়া বলেন, তাকে আমি খুব পছন্দ করতাম। আমার বাড়িতে তাকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছিলাম। এই ঘটনায় যতটুকু সহযোগিতা করা লাগে আমি করবো।
নিহত দিলোয়ারের বড় ভাই আলী হোসেন ও নিকটাত্মীয় মো. সোহেল মিয়া বলেন, দিলোয়ার হোসেন ভাইয়ের সন্তানগুলো একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে। তাদেরকে আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করবো। তবে, কে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই মামলা দায়ের করা হবে। আমরা প্রশাসনের কাছে আশা করছি, যে বা যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের সবাইকে গ্রেফতার করতে হবে। আমাদের এলাকার কেউ জড়িত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখতে হবে।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকরাম আলী বলেন, এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা না হলেও পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরতে খুবই তৎপর রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের নাম বার বার এসেছে। আমরা তার বাড়িতে খুঁজ নিয়েছি সে পলাতক আছে। এ জন্য তার প্রতি সন্দেহটা আরও বেশি। আষা করছি খুব দ্রুত এই ঘটনার জট খুলে যাবে।