জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পর পর দুই দফা বন্যায় শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তলিয়েছিলো গ্রামীণ রাস্তাঘাটসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। পানির স্রোতে সড়কগুলোর অনেক জায়গায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে, কোনো কোনো জায়গায় উঠে গেছে ঢালাই অংশ। গর্ত সৃষ্টি হয়ে চলাচলের এসব সড়ক যেনো এখন মানুষের মরণ ফাঁদ তৈরি হয়ে আছে। উপজেলার আট ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও হাটবাজারের এসব পৃথক সড়কের নষ্ট হওয়া অংশের মোট দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। এতে যেমন দুর্ভোগ বেড়েছে এ উপজেলার হাজারো মানুষের তেমনি বেড়েছে দূর্ঘটনা ঘটার প্রবল শঙ্কা! বন্যায় শুধুমাত্র সড়কেই সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় দেড়শো কোটি টাকা। এসব তথ্য জানিয়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের একটি সূত্র। তবে সড়ক সংস্কারের এসব কাজ বিদেশি অর্থায়নে হয়ে থাকে৷ সবগুলো রাস্তার প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে, কাজ বন্ধ না হয়ে সংস্কার কাজ চলমান থাকার আশা ব্যক্ত করেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আল নূর তারেক।
উপজেলা এলজিইডির কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের একাধিকবারের বন্যায় দরগাপাশা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া মিনাবাজার থেকে ইসলামপুরের সড়ক, ছয়হাড়া মৌগাঁও পয়েন্ট থেকে আমরিয়া-বাংলা বাজারের সড়ক, পাগলা-বীরগাও সড়ক, বীরগাঁও বাজার থেকে উমেদনগরের (লাউগাঙ) সড়ক, বীরগাঁও কবরস্থান পয়েন্ট থেকে ফয়জুল হক মার্কেটের সড়ক, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি বাজারের সড়ক, দামোধরতপী-আলমপুর-ডিগারকান্দি সড়ক, জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের সড়ক, নোয়াখালী বাজার থেকে ভীমখালী বাজার সড়ক, ডুংরিয়া থেকে রজনীগঞ্জ সড়ক এবং গণিগঞ্জ থেকে মুরাদপুরসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি সড়ক পানিতে ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ সড়কের আনুমানিক মোট দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। যারা সংস্কার ব্যায় ধরা হয়েছে প্রায় ১শ’ ৫০ কোটি টাকা। প্রকল্প প্রস্তুত করে সড়ক সংস্কারের অর্থ অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

বন্যায় ভেঙে যাওয়া আক্তাপাড়া-ইসলামপুরের সড়কের চিত্র।
শুক্রবার সরেজমিনে শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া মিনাবাজার থেকে ইসলামপুর সড়ক ও পাগলা-বীরগাঁও সড়ক ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। এম মধ্যে আক্তাপাড়া-ইসলামপুর সড়কটি প্রায় চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যানবাহনে চলাচল করার কোনো উপায় নেই। আক্তাপাড়া গ্রামের প্রবশদ্বার থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক পথে এমন কোনো যায়গা নেই যেখানে সড়কটি ভাঙা নেই। টমটম অটোরিকশা কোনো রকমে চলাচল করলেও দেড় কিলোমিটার পথ যেতে চালক ভাড়া হাঁকায় ৫০ থেকে ১শ’ টাকা। প্রায় তিন কিলোমিটারের এই সড়ক ধরে ইসলামপুরের দিকে এগুলে ভাঙা সড়কের জ্যান্ত চিত্রই শুধু চোখে পড়বে। রাস্তাটি এমনভাবে ভেঙে গিয়েছে যে, কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারতো না। পরে এলাকাবাসী মিলে হাতুড়ি, শাবল, বড় পাথর ইত্যাদি দিয়ে রাস্তাটি ধুরমুজ করে সমান করে দেওয়ার পর কোনো রকমে একটি দুটি টমটম অটোরিকশা চলাচল করে। অটোরিকশা চালকদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, রাস্তা ভাঙা থাকলে ভালো। ছোটো ছোটো ট্রিপে বেশি ভাড়া পাওয়া যায়।
আক্তাপাড়া মিনাবাজার থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে আক্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নামেন সাদিকুর রহমান নামের একজন ভুক্তভোগী। সর্বোচ্চ ১ কিলোমিটার পথ টমটমে এসেছেন তিনি। ভাড়া গুনতে হয়েছে ১শ’ টাকা। ভিতরে ভিতরে চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাদিকুর৷ এসময় সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে দেওয়ার দাবি করেন আক্তাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শায়খুল ইসলাম ও বকুল মিয়া।

পাগলা-বীরগাঁও সড়কের ভাঙা অংশের চিত্র।
অপরদিকে, পাগলা-বীরগাঁও সড়কেরও বেহাল দশা। পাগলা বাজার থেকে পাগলা পশ্চিমপাড়ার জমিরুল ইসলাম ওরফে জম্মু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সড়কটি খুব একটা ভাঙা না থাকলেও এরপর থেকে শুরু হয় ভাঙা অংশের গণনা। বিশেষ করে বড়ভাঙা নামক স্থান থেকে সড়কের বেহাল দশা চোখে পড়ার মতো। সড়কের পূর্বাংশ থেকে ভাঙতে ভাঙতে একেবারে মূল সড়কের মাঝখান পর্যন্ত চলে এসেছে ভাঙা অংশ। এতে সাধারণ দুটি সিএনজি ফোরস্ট্রোকও একটি আরেকটিকে ওভারক্রস করতে পারেনা। একদিক থেকে সিএনজি আসলে অপরদিকের সিএনজি অপেক্ষা করে থাকতে হয়। এতে সড়কে বাড়ছে সড়ক দূর্ঘটনার প্রবল শঙ্কা। মূলত: বর্ষায় পাখিমারা হাওরের পূবালী ঢেউ রাস্তায় আঁচড়ে পরার কারণে রাস্তাটি বার বার ভাঙে। এলাকার মানুষের একটাই দাবি একটি স্থায়ী সমাধান যেনো দেওয়া হয় এই সড়কের ব্যপারে৷ বছর বছর বন্যা হবে আর সরকারের লোকজন বছর বছর গড়বেন সেটা তো ঠিক না। স্থায়ী সমাধান করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেক মুরব্বি ও এলাকাবাসী। মাঝে মাঝে নিজ উদ্যোগে সমাজকর্মীরা রাস্তার কাজের উদ্যোগ নিলেও সরকারের স্থায়ী পৃষ্ঠপোষকতা চান স্থানীয়রা।
শুধু আক্তাপাড়া-ইসলামপুর কিংবা পাগলা-বীরগাঁও সড়কই নয় উপজেলার সব সড়কের সংস্কার চান সকলেই।
বীরগাঁও গ্রামের সিএনজি ফোরস্ট্রোক চালক সাদিকুর রহমান, হেলাল উদ্দিন ও পশ্চিম পাগলার ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের চালক সেলিম মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা এ সড়কে সিএনজি চালাই। বছর বছর বন্যা আসে, বর্ষা আসে আর পাখিমারা হাওরের ঢেউয়ে সড়ক ভাঙে। এখন সড়কের বেহাল দশা। দ্রুত সংস্কার করে দেওয়ার জোর দাবি করছি। যে কোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনায় ঘটে যেতে পারে।
বীরগাঁও গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি মনর উদ্দিন ও খালপাড় গ্রামের মুরব্বি কূহিনূর রহমান বলেন, দুই বছর এক বছর পরেই পাখিমারা হাওরের পূবাল ঢেউয়ে খালপাড়ের ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক ভাঙে৷ সরকারের লোকজন এসে ঢিলাঢালা ভাবে কাজ করে দিয়ে যায়। কোনো রকম মুখ রক্ষার মতো। আসলে কী কাজ যে তারা করে সেটা তারাই জানে। কাজের মান খুব একটা ভালো হয় না। ভালোভাবে কাজ করতে হবে। বছর বছর সংস্কার না করে শক্তপোক্ত করে গার্ডওয়াল দিয়ে কাজ করলে আর ভাঙার আশঙ্কা থাকবে না। রাস্তায় কাজ করার সময় মাটি ফেলে মাটি বসার পর ঢালাইয়ের কাজ বা ব্লক বসাতে হবে। না হলে এসবও ঠিকবে না।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আল নূর তারেক বলেন, এ বছরের বন্যায় উপজেলার প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। যারা অর্থ মূল্য দেড়শো কোটি টাকার মতো। আমরা চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। আশা করছি চলমান পরিস্থিতির কারণে রাস্তা সংস্কার কাজ আটকাবে না। কারণ এগুলো বিদেশি অর্থায়নে কাজ হয়। যত দ্রুত সম্ভব কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।