রাত পোহালেই বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাচন ।। লড়াই হবে ত্রিমুখি

প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২৪ 254 views
শেয়ার করুন

রাত পোহালেই শুরু হবে ৬ষ্ঠ বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছেন ৯জন প্রার্থী। তন্মধ্যে, ৮ জন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত আর ১জন বিএনপি সমর্থক। নির্বাচনী মাঠের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী চেয়ারম্যান পদে ভোটের মূল লড়াই হবে ত্রিমুখি, আর এই ৩ জনই আওয়ামী লীগের। তারা হলেন, শালিক পাখি প্রতীকের গৌছ উদ্দিন, হেলিকপ্টার প্রতীকের মোঃ আবুল কাশেম পল্লব ও মোটর সাইকেল প্রতীকের দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল। এই তিন প্রার্থীর মধ্যে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। অন্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে মূল লড়াইয়ে উঠে আসার বাস্তবিক আর কোন সম্ভাবনা নেই। তবে এগিয়ে থাকা এই তিন প্রার্থীর মধ্যে ভোটের চাঁদরাতের শেষ কারিশমায় বর্তমান হিসাবে উল্টপাল্ট ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এদিকে, একদিকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে একাধিক প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে আশংকা বিরাজ করছে। অন্যদিকে অবিরাম বৃষ্টির ফলে বৈরী আবহওয়া জনিত কারনে গোটা উপজেলা সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত অন্ধকারে ছিল। এতে করে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও বিকল হয়ে পড়েছে। বিকালের পর শহর অঞ্চলে বিদ্যুৎ আসলেও এখনো গ্রামাঞ্চল বিদ্যুৎহীন। গোটা উপজেলা জুড়ে এখনো মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সচল হয়নি। ফলে অন্ধকার ও যোগযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অনেকটা ভূতড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে বিয়ানীবাজারে।

 

৩য় ধাপে ২৯ মে বুধবার অনুষ্ঠিতব্য বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা, মিছিল-মিটিং। চলছে শেষ মুুর্হুতের হিসাব-নিকাশ, কাঁচা টাকায় ভাঙ্গাগড়ার খেলা। নানা সমীকরণ আর মেরুকরনের ছক দিয়ে চলছে এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষ বধের প্রয়াস। বাতাসে ছড়াচ্ছে নানা গুঞ্জন, প্রপাগান্ডা আর মুখরোচক কাহিনী। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশংকা নিয়েও কেউ কেউ উদ্বিগ্ন। আবার উৎসাহী ভোটারদের তর সইছে না ভোট দেয়ার অপেক্ষায়। ভোট কেন্দ্র গুলোতে বৃষ্টির মধ্যেই চলছে পোষ্টার, ফেস্টুন, ব্যানার টাঙ্গানোর হিড়িক। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ভোট গ্রহণের প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি। সবমিলিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলাবাসী এখন নির্বাচনমুখি, উপজেলা জুড়ে বইছে নির্বাচনী উৎসবের আমেজ। তবে বে-রসিক বৃষ্টির ভাগড়া আর বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওর্য়াকহীনতা ভোগান্তিতে ফেলে দিয়েছে নির্বাচনী সকল আয়োজন। মোবাইল ফোন অপারটের গুলো টাওয়ারে বিদ্যুৎ না থাকায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনেকটা যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছেন উপজেলাবাসী। এতে করে অপুরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন প্রার্থী ও কর্মী, সমর্থকরা।

 

এই উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তন্মধ্যে, বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আবুল কাশেম পল্লব, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামাল হোসেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোঃ আব্দুল বারী, লাউতা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ গৌছ উদ্দিন, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের খন্ডকালীন প্রভাষক সাংবাদিক মোঃ জহির উদ্দিন ও প্রবাসী বিএনপি নেতা মোঃ জাকির হোসেন সুমন।

 

প্রত্যেক প্রার্থীই নির্বাচনে কাঙ্খিত বিজয় অর্জনের জন্য নিজ নিজ কর্মী সমর্থকদের সকাল থেকে শেষ রাত অবধি চালিয়েছেন প্রচার-প্রচারণা, মিছিল-মিটিং, ছুটে গেছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। ভোটারদের মন জয় করতে দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রæতি, প্রতিদ্বন্ধিদের নিয়ে বলেছেন নানা কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলেছে জোর প্রচারণা, হয়েছে নানা বির্তক, বাকবিতন্ডা। কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা বা আচরণবিধি লংঘন ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনী সকল কর্মকান্ড চালিয়েছেন সকল প্রার্থীই। ভোটের মাঠের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ৯জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতায় থাকলেও উল্লেখ্যযোগ্য ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন ৫ জন প্রার্থী। তন্মধ্যে আতাউর রহমান খান ও মোঃ জামাল হোসেন নির্বাচনে উল্লেখ্যযোগ্য ভোট পাচ্ছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা দুজনই সজ্জন ব্যক্তিত্ব এবং ফুলটাইম রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগের দলীয় আদর্শের সাথে এই দুই প্রার্থী কখনো আপোষ করেননি। তবে তাদের সম্ভাব্য ভোটের হার বিজয়ী হওয়ার মূল দৌড় থেকে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

নির্বাচনের শেষ লগ্নে এসে বিজয়ী হওয়ার চূড়ান্ত ত্রিমুখি লড়াইয়ে থাকা ৩জনের একজন হলেন দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিগত ১৫ বছর স্থানীয় এমপি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড বন্টন ও দেখা শুনার দায়িত্বে থাকার সুবাধে উপজেলা জুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার অনুসারী বলয় ও ভোট ব্যাংক তৈরী হয়েছে। তাছাড়া সজ্জন ভদ্রলোক হিসেবেও তার গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে সুশীল ভোটারদের কাছে। তাছাড়া জামায়াত-বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীরা আন্ডার গ্রাউন্ডে তার পক্ষে কাজ করছেন। সেই হিসেবে নির্বাচনী ত্রিমুখি লড়াইয়ে রয়েছেন মোটর সাইকেল প্রতীকের এই প্রার্থী। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হওয়া আউয়ালের মোটর সাইকেল ভোটের মহাসড়কে প্রথম দিকে যতোটা গতিতে চলছিল, শেষ সময়ে এসে ভাঙ্গাগড়ার নানা সমীকরনে মোটর সাইকেল কিছুটা গতি হারিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। ফলে মূল প্রতিদ্বন্ধিতায় থাকা আকাশ পথের হেলিকপ্টার ও শালিক পাখির সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই থেকে মোটর সাইকেল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে ।

 

বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আবুল কাশেম পল্লব রাজনীতির মাঠের পোড় খাওয়া পাক্কা খেলোয়াড় ও এক বিজয়ী নেতা। ছাত্রনেতা থেকে একাধিকবার জনপ্রতিনিধি হওয়া পল্লবের ভোটের মাঠের অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। তিনি জানেন কখন কাকে কিভাবে বশে আনতে হয়। উপজেলা জুড়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নিজস্ব একটি গ্রæপ রয়েছে। রয়েছে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে পল্লবের উল্লেখ্যযোগ্য একদল ভোটার। আর পল্লব গ্রæপের নেতাকর্মীরা হেলিকপ্টারের বিজয় নিশ্চিত করতে রাতদিন এক করে ভোটের মাঠে কাজ করছেন। ফলে ভোটের মাঠে দিন দিন হেলিকপ্টারের গতি ভাড়ছে। গড় ভোটের হিসেবে অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন পল্লব। তবে হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন থামিয়ে দিতে কোমর বেঁধে মাঠে রয়েছেন উপজেলার জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ এবং বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশে পল্লবের বক্তব্যে মনক্ষুণ হওয়া কিছু অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। শেষ পর্যন্ত এই দুটি বাধা অন্যান্য অঞ্চলের ভোট দিয়ে কাভার করতে পারলে ফের উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসছেন মোঃ আবুল কাশেম পল্লব।

 

এবারের উপজেলা নির্বাচনে চমক জাগানিয়া প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যে আর্ভিভূত হয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা মোঃ গৌছ উদ্দিন। লাউতা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ গৌছ উদ্দিন ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়ে সেখানকার হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে চমক দেখিয়ে ছিলেন। এবারের উপজেলা নির্বাচনেও চমক দেখাচ্ছে তার শালিক পাখি। হঠাৎ করে প্রার্থী হয়ে উপজেলার তৃণমূলের ভোটারদের কাছ থেকে যে স্বর্তস্ফুত সাড়া পাচ্ছেন গৌছ উদ্দিন তা একধরনের অকল্পনীয়। লাউতা থেকে আলীনগর পর্যন্ত তার ভোটাররা সাড়া তুলতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের মুখে মুখে এখন শালিক পাখির সুর। নির্বাচনী মাঠের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী হেলিকপ্টারের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে শালিক পাখির। বিশ্লেষকদের অভিমত নিজের ভোট ধরে রাখতে পারলে আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২৯ তারিখ চমক দেখিয়ে বিজয় রথে উড়বে তৃণমূলের শালিক পাখি।

 

তথাপিও ভোটের চাঁদরাতের সর্বশেষ হিসাব-নিকাশ আর ভাঙ্গাগড়ার খেলায় নির্বাচনী মাঠের তথ্যে পরিবর্তনও আসতে পারে। চূড়ান্ত ফলাফল জানতে ২৯ তারিখ ফলাফল ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং জনিত কিছু না হলে অবশ্যই ত্রিমুখি লড়াইয়ের বাহির থাকা অন্য কোন প্রার্থী বিজয়ের সম্ভাবনা বাস্তবিক অর্থে নাই বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। একাধিক প্রার্থী ও সচেতন মহল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আশংকার মধ্যে রয়েছেন।

উপজেলা নির্বাচন অফিসার ও সহকারী রিটানিং কমকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচন সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যে সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রশাসন সম্মূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।