বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাত, প্রেক্ষিত ও সমকালীন ভাবনা

ফরহাদ হুসাইন ফরহাদ হুসাইন

সংযু্ক্ত আরব আমিরাত

প্রকাশিত: ১:২৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০২১ 188 views
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটা গল্প আমরা অনেকেই জানি। আজ গল্পটা দিয়েই শুরু করব। গল্পটা এরকম- একটি সমাজে একজন দুষ্ট লোক ছিল। সমাজে প্যাঁচ লাগানোই ছিল লোকটির একমাত্র কাজ। একদিন বাজারে গিয়ে সে দেখলো সবাই শান্তিতে কেনাবেচা করছে, এই শান্তি তার সহ্য হলো না, তাই পরিকল্পনা পাকিয়ে ফেলল কিভাবে বাজারের এই শান্তি নষ্ট করা যায়। গম্ভীর মুখে গুড়ের হাটে গিয়ে একজন গুড় বিক্রেতার কাছে গিয়ে গুড় দেখার ভঙ্গিতে গুড়ের হাড়ির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল। গুড় ওয়ালা তেড়ে আসতেই গুড়ের হাত মুছে দিল দোকানের খুঁটিতে। অতঃপর গুড়ের গন্ধে পিঁপড়া ভিড় করলো,পিঁপড়া ধরতে এলো টিকটিকে, আর টিকটিকে ধরতে হাজির বিড়াল। বিড়ালের উপর হামলে পড়লো কুকুর, একটি কুকুরকে দেখে হাজির হলো প্রতিপক্ষ আরো একটি কুকুর, দু’কুকুরের তুমুল লড়াইয়ে যখন এক কুকুর আহত তখন প্রেক্ষাপটে এলো কুকুর দুটির দুই মালিক। দুই মালিকপক্ষের লোকজন মিলে তুমুল দাঙ্গায় দিনের হাট যখন রণক্ষেত্র তখন দুষ্টু লোকটা দুরে দাঁড়িয়ে নিরোর মত বাঁশি বা বোগল বাজাতে লাগলো। গল্পটি অনেকের ই জানা তবে এখান আমরা শিক্ষা নিতে পারি না।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সম্প্রদায়িক সংঘাত নিয়ে শান্ত মাথায় কিছু লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরিস্থিতি ঘটনা পরম্পরায় অশান্তই রয়ে গেছে। দৃশ্যপট এখন কুমিল্লার নানুয়াদিঘিরপাড়ের মন্দির থেকে ভারতের ত্রিপুরা হয়ে এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পার্লামেন্টে। তাই বিষয়টি মোটেও এমন নয় যে, বৃষ্টিধারা থামার পর ছাতা ধরছি। ঘটনার আবহে ছিল একটি মণ্ডপে কুরআন রাখা। কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর কোন ভাবে মেলাতে পারছি না। কোন মুসলিম, হোক সে নামাজি বা আমার মত আম জনতা সে-কী সজ্ঞানে গীতা বা ত্রিপিটক মসজিদের মেহরাবে রাখবে? কখনোই না, কারণ গীতা বা ত্রিপিটক পবিত্র গ্রন্থ হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের মানুষের কাছে এবং তার শোভনীয় স্থান নিশ্চয় মন্দির বা প্যাগোডা; মসজিদ নয়। যদি তাই হয় তাহলে কেন একজন পুরোহিত বা আম হিন্দু হনুমান মূর্তির পায়ের উপর কুরআন রাখতে যাবে? হিন্দুরা হাজার বছর ধরে প্রতিমা পুজা করে আসছে আগে ত কখনো কুরআন হনুমান মূর্তির পাশে রাখেননি তাতে কি পুজা সিদ্ধ হয়নি? তাহলে হঠাৎ কেন কুরআন দরকার হলো? যারা রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন, তাদের কথা ভিন্ন , কারণ সে ভাষার অভিধান ই অন্যরকম কিন্তু মোটা মাথার মানুষটি ও বুঝবে কোন হিন্দু একাজ করতে পারে না, অথচ কতিপয় লোক ধর্মীয় লেবাসে আবার কিছুলোক রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে লেবাস পাল্টিয়ে নেমে গেল, মন্দির-মন্ডপ ভাঙতে, হিন্দু বাড়ীতে আগুন লাগাতে, লুট করতে, যেন বিধর্মী দমনের মোক্ষম হাতিয়ার। আচ্ছা ভাই, ধর্মের কোন ধারায় বলা আছে পরধর্মের মন্দির ভাঙতে, শিশু বৃদ্ধার উপর হামলা করতে, ফসল নষ্ট করতে বা বাড়ীতে আগুন দিতে। বরং যুদ্ধাবস্থায় ও নবী (সঃ) এই সব কাজ করতে নিষেধ করছেন। কুরআনের সুরা আন-আমের ১০৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আর তোমরা তাদেরকে(দেব-দেবীকে)গালমন্দ করো না, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, ফলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত। এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্ম শোভিত করে দিয়েছি। তারপর তাদের রবের কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি জানিয়ে দেবেন তাদেরকে, যা তারা করত।।যারা হিন্দুদের সবচেয়ে আনন্দ মুখর সময়ে এই নিষ্ঠুর ধ্বংসযোগ্য করলেন তারা কি একবার ভাবলেন না হিন্দুরা এদেশের নাগরিক, আমাদের প্রতিবেশী, একসাথেই ত আমরা চলি, সামাজিক রীতিতে অংশ গ্রহন করি। যারা ধর্মের নামে শ্লোগান দিয়ে মূর্তি ভাঙলেন তারা কি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে ধর্ম অবমাননা করেননি?

মণ্ডপে কুরআন কে রেখেছে সেটা নিয়ে ত আর বিতর্ক নেই। অপরাধী ইকবাল না হয়ে যদি ইন্দ্রজিত হতো? কুরআন কি এতই ঠুনকো যে মন্দিরে রাখলেই তার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়, অথচ আল্লাহ কোরআনকে সর্ব যুগের সকল মানব কল্যাণে নাজিল করেছেন অর্থাৎ “হুদাল্লিন নাস” যা কোরআনেই বলা আছে। কিন্তু কোরআন যদি সঠিক পথের নির্দেশনা বা সাফল্যের রাস্তা হয়ে থাকে তাহলে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খিস্টান যে কেউ কুরআন পড়তে পারে ধরত পারে তাতে ত কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।
যারা মুসলিম হয়ে কুরআন পড়তে জানে না, বা পড়ে না, মানে না, নিজের জীবনে তার অনুশীলন করেনা, তারা কি কুরআন অবমাননা করেনা, যারা ধর্মের নামে অধর্মের কাজ করে, সুদ খায়, সরকারি অফিসে ঘুষের বিনিমনে কাজ করে, জিনা করে, তারা কি ধর্ম অবমাননা করে না, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে কখনো মিছিল করেছি নাকি কোন ঘুষখোরের ঘরের ইট খুলে গরীব মানুষের মাঝে বিলি করে ধর্ম অবমাননার প্রতিশোধ নিয়েছি? আমাদের জিহাদী জোস কেবল সংখ্যালঘু পরধর্মের উপর কেন? অথচ নবী মোহাম্মাদ (সঃ) কোন রাষ্ট্রে সংখ্যা গুরুদের কাছে সংখ্যা লঘুরা আমানত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

যারা কোন উপলক্ষ্য পেলেই হামলে পড়েন, হিন্দু বা পরধর্মের উপর তারা কখনো ভেবেছেন এই ছোট্র রাষ্ট্রের সিমানা পার হলেই পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তর রাষ্ট্র যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু? বাংলাদেশের মাত্র 1 কোটি 23 লাখ হিন্দু যদি তাড়িয়ে দেন তাহলে ভারত ও তাড়িয়ে দিতে পারে 20 কোটি মুসলিম? ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। গত ২০ অক্টোবর রাজ্যজুড়ে চলা এই হামলায় অন্তত ছয়টি মসজিদ এবং এক ডজনেরও বেশি বাড়িঘর-দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়েছে। মসজিদ গুলোতে পুড়ে কয়লা সাদৃশ্য কুরআন মুসলমানদের কালিজায় যে নিদারুন ব্যাথা লেগেছে ; ঠিক সেই অন্তর নিয়ে একবার ভাবুন সার্বজনীন দূর্গা উৎসবে ভাঙ্গা খন্ডবিখন্ড প্রতিমা ভক্তপ্রান হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রানে ত একই ব্যথা লেগেছে।

পৃথিবীর বহুদেশে হিন্দু সম্প্রদয় বসবাস করে, কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে বহু মুসলিম দেশে শান্তিপূর্ণ ভাবে হিন্দুরা বসবাস করছে, খোদ আফগানিস্থানে হিন্দুদের বসবাস রয়েছে। পাকিস্থানে তেত্রিশ লাখ ত্রিশ হাজার হিন্দুর বসবাস, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় চল্লিশ লাখ পঞ্চম হাজার হিন্দু রয়েছে এছাড়া হিন্দু বসবাস করে গ্রেট ব্রিটেন, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় হিন্দুরা সম্প্রদায় বসবাস করে। কারো যদি সমস্যা না হলে আমাদের কেন এত সমস্যা?

৪৭ পূর্ব বাংলাদেশে ৪০% হিন্দু এদেশের নাগরিক ছিল, হিন্দুরা এদেশে জম্মেছে তাদের নাগরিক অধিকার আর দশজন মুসলিমের সমান। তাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেদের সমাধান করতে হবে। ফিলিস্তিনের পর ভারতের কাশ্মির মুসলিম নির্যাতনের কেন্দ্র, সেটা যেমন ভারতের মানুষের নিজস্ব বিষয়, তারা পারস্পারিক সামাজিক রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যেমে সমাধান করবে, তেমনি আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক সাম্প্রতির কোন শূন্যতা হলে সমাধান আমরাই করব। আর কোন মন্দিরে হামলা যেমন কাম্য নয় তেমনি বাংলাদেশের কোন ঘটনায় ভারতের মসজিদে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক দল যেমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দয তেমনি রাষ্ট্রের সৌন্দর্য বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ মত ও পথের মানুষের সংমিশ্রণে একটি সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করা। প্রতিদিন যেমন মসজিদ থেকে পাঁচবার আজানের ধ্বনিকে ভাতৃপ্রতীম ভাইয়ের মত মেনে নিয়ে শ্রবণ করে তেমনি আমাদের মুসলমানদের ও উচিত হিন্দুদের সন্ধ্যার শাঁখের আওয়াজ বা উলুধ্বনি , বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানদের ঘন্টা ধ্বনিকে একইভাবে মেনে নেয়া।

লেখক: আবুধাবী প্রবাসি, সংযুক্ত আরব আমিরাত