চিহ্নিত, তবুও অধরা কক্সবাজারের মাদক ব্যবসায়ী কায়সার

শাহীন মাহমুদ শাহীন মাহমুদ

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৮:৩৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০ 896 views
শেয়ার করুন
এলাকাবাসী, পঞ্চায়েত কমিটি, ওয়ার্ড মেম্বার, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর-সবাই জানে, রামু উপজেলার তেচ্ছিপুল এলাকায় মাদকের মূল ব্যবসায়ী কারা। কারো কারো বিরুদ্ধে থানায় মামলাও আছে। প্রশাসনের কাছে আছে তাদের বাসাবাড়ির ঠিকানাও। কিন্তু তারা আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক সুত্র বলছে, চাকমারকুল-ফতেখারকুল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী তেচ্ছিপুল এলাকায় মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন ওই এলাকার বাসীন্দা মো: ইসলাম ড্রাইভারের ছেলে কায়সার (২৬) ও মৃত গোলাম আকবরের ছেলে রাকিব (২২)। তারা উখিয়া টেকনাফের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইয়াবা এলাকায় আনেন। বিক্রি করেন তাদের সহায়তাকারীরা। এর মধ্যে কায়সার এলাকায় ‘ইয়াবা সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। ইয়াবা ব্যবসাও তার হাতে। আর প্রধান সহযোগী হিসেবে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন রাকিব।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, তথ্য থাকলেও কৌশল ও জনবলের দিক দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পেরে উঠছেন না তাঁরা। আর পুলিশ বলছে, মাদকের এই হোতাদের ধরতে তাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।
এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, পড়ালেখায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতে পারেনি কায়সার। তার বাবা ছিলেন একজন ড্রাইভার। কিন্তু বাবা গাড়ি চালালেও চলছিল না তাদের পরিবার। তাই নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার কোন এক মোটরসাইকেল গ্যারেজ মেকানিকের কাজ নেন কায়সার। কিন্তু ঠিকমতো মোটরসাইকেলের নাট বল্টু খুলতে না পারলেও খুলেছিলেন এক উপজাতি নারীর মন। কিছুদিন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে মেয়েটিকে ভাগিয়ে নিয়ে নিরুদ্দেশ হন তিনি।
বিভোর স্বপ্ন নিয়ে তারা দুজন সংসার বাঁধলেও সম্পর্কটি মেনে নেয়নি মেয়ের পরিবার। ঠুকে দেন মামলাও। সেই মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আসে কায়সার। হয়ে যান ভভঘুরে। কিছুদিন যেতে না যেতে না ফেরার দেশে চলে যান তার বাবা। বাবাকে হারিয়ে চোখের সামনে অনিশ্চয়তার ছবি আর পেটে উদগ্র ক্ষুধা নিয়ে রামু বাইপাস এলাকার সিটিপার্কের সামনে মোটরসাইকেল গ্যারেজ দেন সে।
কিন্তু সেই গ্যারেজে মোটরসাইকেল নিয়ে নিয়মিত আসেন মন্ডলপাড়া এলাকার কিছু উঠতি বয়সী মাদক ব্যবসায়ী। বন্ধুত্ব হয় তাদের সাথে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে যুক্ত হন মাদক ব্যবসার সঙ্গে। উখিয়া-টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে প্রথমে পাচার করতে থাকেন নিজ এলাকায়। এরপর পাচার শুরু করেন সারাদেশে।
এভাবেই চেনা হয় চোরাচালানের অলিগলি। শুরু করেন ভয়ঙ্কর মাদক পাচার। মাত্র এক বছর এ মাদক বেচাকেনা করে আমূল বদলে গেছেন তিনি। ছেড়ে দেন গ্যারেজের কাজ। নিজ চাচা থেকে ক্রয় করেছেন জমিও।  বর্তমানে দৃশ্যমান ব্যবসা নেই তবুও ইয়াবার ছোঁয়ায় রাতারাতি বদলে যাওয়া এ ব্যক্তির নাম কায়সার। নিজেকে বেকার দাবী করলেও নিজ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় নাম থাকা এ ব্যক্তিকে এলাকায় চেনে ‘ইয়াবা কায়সার’ নামে। গড়ে তুলেন মাদকের চক্র। ওই চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্বপালন করে রাকিব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক  ব্যাক্তি বলেন, কিছুদিন আগে ব্যাক্তিগত কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে অনুমানিক রাত দেড় টা হয়। তখন গাড়ী থেকে নেমে দেখি কায়সার পলিথিনে মোড়ানো একটি ব্যাগ মহাসড়কে দাড়িয়ে থাকা কালো রংয়ের একটি প্রাইভেট কারে দিয়ে দেয়।  ব্যাগটি নিয়ে গাড়ীটি দ্রুত চলে যায় বলে জানান এই ব্যাক্তি।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তেচ্ছিপুল এলাকায় গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মাদক ব্যবসায়ী আর স্থানীয় ও বহিরাগত ক্রেতাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ তাঁরা। তাঁদের প্রশ্ন, ব্যবসায়ীরা চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন তারা ধরা পড়ছে না। প্রশাসন সবকিছু জানলেও এলাকায় কীভাবে মাদকের বিস্তার ঘটছে?
বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে গোপনে বিক্রি হলেও দুই বছর ধরে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে তেচ্ছিপুল এলাকার বিভিন্ন স্পটে। স্থানীয় ক্রেতার পাশাপাশি এসব জায়গায় মাদক কিনতে আসেন বহিরাগতরাও। এরা রাস্তা ও গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ইভ টিজিংও করে স্কুলগামীদের।
অভিযুক্ত কায়সার বলেন, আমি বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় আছি, ভিসাও এসেছে, ডলডাউনে আটকে গেছি। আমি গরীবের ছেলে, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি। তার বিরুদ্ধে মাদকের কোন মামলা নেই বলে দাবী করেন তিনি।
রামু থানার নবাগত ওসি কে এম আজমিরুজ্জামান জানান, তার বিরুদ্ধে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। কি মামলা আছে, কার কি প্রোফাইল সব কিছু যাচাই করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।