কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর উপর খুরুশকুল ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নির্মিত পুরাতন জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটি এখন চলাচলকারীদের জন্য মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। নির্মাণের পর দেড় যুগ অতিবাহিত হলেও মেরামতের কোন খোঁজ খবর নেই।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের গাফিলতির কারনে মেয়াদউত্তীর্ণ এই ব্রিজে পাটাতন ভেঙ্গে প্রতিনিয়তই ঘটছে অহরহ দুর্ঘটনা। বিকল্প সড়ক না থাকায় প্রতিদিন বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতু দিয়ে চলাচল করছে যানবাহনসহ হাজার হাজার যাত্রী ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, খুরুশকুল ব্রিজের দীর্ঘদিনে ইস্পাতে পাটাতনগুলোতে অসংখ্য ফাটল আর সেই ফাটলের উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে নীচে নদীর পানিসহ বালুচর। পাটাতনের ফাটলগুলো বন্ধ করতে ব্রিজের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত দেখা হচ্ছে লোহার ঝালাইয়ের অসংখ্য জোরাতালি। ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ী চলাচলের সময় শুনা যায় নড়বড়ে ষ্টীলের পাটাতনের বিকট শব্দ।
আর কিছু কিছু জায়গা লোহার ফ্রেমের উপর ভাসানো পাটাতনগুলো নড়বরে হয়ে যাওয়া ছোটবড় কোন গাড়ী ব্রিজের উপর দিয়ে চলাচলের সময় গাড়ীর চাকা ভারে পাটাতনের এক পাশে নীচে আর অপর পাশে উপরে উঠে যাচ্ছে। ফলে যে কোন সময় লোহার ফ্রেম উপর অস্থায়ী অবস্থায় বসানো পাটাতন সরে গিয়ে পিস পয়েন্ট ফাঁকা হয়ে পড়ছে। পাটাতন উল্টে গিয়ে সরে নীচে পড়ে আছে ও রেলিং খুলে পড়ায় নাটবল্টুসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন থেকেই ঝুঁকি নিয়ে এ পথে চলাচল করছে ছোট বড় শত শত যানবাহন। ২ বছর আগে ঝুকি কমাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে ভারী গাড়ী চলাচল বন্ধ করলেও ব্রিজটির সামনে ও পিছনে নেই কোন ধরনের সওজ কর্তৃপক্ষের সতর্কবানী।
ব্রিজের পিস পয়েন্ট খুলে গিয়ে এ স্থানে কয়েকবার দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। বিশেষ করে শীতের সময় রাতে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় দূরে দেখা না যাওয়ায় যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রানহাণীর আশংকা রয়েছে। তাই দ্রুত পাটাতন বদলে দিয়ে সংস্কার করার দাবী জানান এলাকাবাসী।
জানা গেছে, পৌর শহরের সব চেয়ে পার্শবতী অঞ্চল হিসেবে খুরুশকুলের মানুষের সঙ্গে এতদঞ্চলের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশি। মূলত বাকঁখালী নদী এই দুই অঞ্চলের মানুষকে এক মোহনায় আসতে না দিলে ২০০৩ সালে এলাকার মানুষের বহু প্রতিক্ষিত খুরুশকুল ব্রিজটি চালু হয়। কক্সবাজার সড়ক জনপদ বিভাগের আওতায় প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
স্থানীয়রা বলছেন, যে কোন এলাকার উন্নয়নের জন্য সেই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন পূর্বশর্ত। মূলত খুরুশকুল ব্রিজটি হওয়ার পরেই এসব এলাকার অভুতপূর্ব পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের জীবন মানের উন্নতি হয়েছে। তাই খুরুশকুল ব্রিজকে শুধু একটি স্থাপনা নয় একটি পরিবর্তনের বাহক হিসাবে চিন্তা করতে হবে। আমরা জানি বর্তমানে ব্রিজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কয়েক বছর আগে ঝুঁকি কমাতে ব্রিজের কক্সবাজার অংশে লোহার গেট দিয়ে ভারী গাড়ী চলাচল বন্ধ করলেও বর্তমানে ঝুকি কমেনি বরং দিন দিন বাড়ছে। তাই এই ব্রিজকে নিয়ে দ্রুত একটি সমন্নিত উন্নয়ন পরিকল্পনা করা জরুরী।
সিএনজি চালক মামুন জানান, ব্রিজের ওপর দিয়ে সিএনজি চলাচল করার সময় মনে হয় ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। শিগগিরই ব্রিজটি সংস্কার অথবা নতুন ব্রিজ করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি। কক্সবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আবু বক্কর জানান, কলেজে আসা-যাওয়ার সময় প্রতিদিনই ব্রিজের ওপর দিয়ে আসতে হচ্ছে। গাড়ি নিয়ে ব্রিজে উঠলেও ভয়ে ভয়ে যেতে হয়। বিকল্প পথ না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
জালালাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমরুল রাশেদ বলেন, খুরুশকুলের জনগণ নয় শুধু, এখানকার ৬টি ইউনিয়নের অন্তত ৭ লাখ মানুষেরও একমাত্র ভরসা ওই খুরুশকুল ব্রিজ। খুরুশকুল ব্রিজ না হলে আমাদের কক্সবাজার শহরে যেতে ঈদগাহ হয়ে প্রায় ২০০ টাকা খরচ করে ২-৩ ঘন্টা সময় অপচয় করতে হতো। কিন্তু এখন খুব অল্প খরচে কম সময়ে শহরে পৌছানো যায়। আমরা বহুবার দাবী করেছি খুরুশকুল ব্রিজটি সংস্কার করার জন্য। এছাড়া একই ব্রিজের পাশে আরও একটি বড় আকারের নতুন করে ব্রিজ করারও দাবী জানান তিনি।
খুরুশকুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ২০০৩ সালে নির্মাণ কাজ শেষ করার পর থেকে এই ব্রিজে কোন ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়নি। ফলে বর্তমানে ব্রিজটি চরম ঝুকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ স্থানের পাটাতন উঠে যাচ্ছে। খুলে গেছে অসংখ্য নাটবল্টু। অনেক জায়গায় ব্রিজের স্টিলএ্যাংগেল খুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং মাটির নীচের অংশেও ঝুকিপূর্ন বলে মনে হচ্ছে। তিনি জানান, বড় ব্রিজ হয়েও একটি গাড়ী চলাচল করতে পারে। একমাথা থেকে একটি গাড়ী উঠলে অন্যপাশে গাড়ী দাড়িয়ে থাকতে হয়। আমরা কয়েক বছর ধরে দাবী করে আসছি ব্রিজটি নতুন করে সংস্কার এবং দুই লাইন বিশিষ্ট করার জন্য তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, খুরুশকুল ব্রিজটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ এটা সঠিক, ইতোমধ্যে আমরা ব্রিজটি পূর্ণসংস্কারের জন্য ডিপিপিতে পাঠিয়েছি। বাজেটও পাস হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে ব্রিজের কাজ শুরু হবে জানান এই কর্মকর্তা।


