‘দেখো বাবা, তোমার কিচ্ছু হবে না’ বাবাকে নিয়ে গল্প-সিনেমায় অনেক কিছু দেখা গেলেও সবকিছুকে যেন হার মানিয়েছে বাবার প্রতি এক ছোট্ট শিশুর ভালোবাসার দৃশ্য। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করে মারধর করছিলেন স্থানীয় লোকজন। চারপাশে মানুষের ভিড়, উত্তেজনা আর চিৎকার। বাবাকে বাঁচাতে হঠাৎ ভিড় ঠেলে ছুটে আসে ৯ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে। হাত জোড় করে বলে, ‘বাবাকে মেরো না।’
আটক ওই ব্যক্তির নাম অনিক হাওলাদার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও একাধিকবার চুরির অভিযোগে তিনি ধরা পড়েছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়গুলো মীমাংসাও করা হয়েছিল।
ভোরে বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে অনিককে আটক করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন স্থানীয়রা। এ দৃশ্য দেখে তার ৯ বছরের মেয়ে বাবাকে বাঁচানোর জন্য কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে এবং উপস্থিত লোকজনকে মারধর বন্ধ করার অনুরোধ করতে থাকে।
এরপর ঘটে যায় আরও এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। বাবার জন্য বাড়ি থেকে চা ও রুটি নিয়ে আসে মেয়েটি। চায়ের মধ্যে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিতে থাকে এবং কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘দেখো বাবা, তোমার কিচ্ছু হবে না।’
বাবার শরীরের ব্যথার জায়গায় ছোট্ট হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে জানতে চায়, ‘বেশি ব্যথা পাইছো বাবা?’ চারপাশের উত্তেজনার মধ্যেও বাবা-মেয়ের এই দৃশ্য অনেককে কাঁদিয়েছে।
পরে মানবিকভাবে বিবেচনায় স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে অনিককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি তদন্ত ফারুক হোসেন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও দেখে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নিয়েছেন। এ ঘটনায় কেউ থানায় কোনো অভিযোগ করেননি।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকায় চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তির ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং একই সময়ে তার ৯ বছরের শিশুকন্যার তাকে খাবার খাইয়ে দেওয়ার ঘটনাটি সমাজের চরম নিষ্ঠুরতা ও আইনি কাঠামোর তোয়াক্কা না করার প্রবণতাকে আরও একবার উন্মোচিত করেছে। এ-সংক্রান্ত কালবেলা অনলাইনের প্রতিবেদনটি পড়লে আপনার তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করতেই হবে।
এক. মাদক কীভাবে একজন যুবকের পারিবারিক জীবন নরকে পরিণত করতে পারে, এই ঘটনায় সেটি স্পষ্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ, তার নাম অনিক সরদার। অনিকের বাবা হাইকোর্টে চাকরি করতেন। ভাই সৌদি আরবে থাকেন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। যে পরিবারে অনিকের বেড়ে ওঠা, তাতে তার চুরি করা লাগে না। কিছুদিন আগেও তার পরিবার ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি ঋণ শোধ করেছে। দেশজুড়ে মাদক এখন সহজলভ্য, আর এই নেশাই মূলত অনিককে এত দূর নিয়ে এসেছে।
দুই. ভাইরাল ভিডিও ঘিরে দাবি করা হয়, অনিক বাজারের দোকানে চুরি করেছেন। কিন্তু গ্রামে গিয়ে জানা যায়, তাকে আটক করা হয় পাশের একটি বাড়ি থেকে। ওই বাড়ির লোকদের দাবি, অনিক গভীর রাতে জানালা দিয়ে মোবাইল ফোন নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় তাকে হাতেনাতে ধরা হয়।
অনিকের স্ত্রীর অভিযোগ, এরপর যারা বাজারে নিয়ে তার স্বামীকে মেরেছে, তাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ আছে। এসব কথা বলার সময় তিনি বিশেষভাবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন: হাকিম খন্দকারের ছেলে আয়াত খন্দকার, খাইরুল ইসলাম, আরিফ, হানিফ, সাকিব ও সাহিদ।
অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে এভাবে আঘাত করা আইনের চোখে অপরাধ। পুলিশ না ডেকে কেন এভাবে মারধর করা হলো—কালবেলার এমন প্রশ্নের মুখে আয়াত খন্দকার বলেন, ‘এর আগেও অনেকবার তাকে ছেড়ে দিয়েছি। এইবার ধরে গণধোলাই দিয়েছি। মেয়ের সামনে আমরা মারিনি।’
এখন পূর্বশত্রুতার জের স্পষ্ট। অনিকের আগে চুরির ইতিহাস আছে, এটা স্থানীয়রা বলেছেন। কিন্তু এই মোবাইল চুরির ঘটনা প্রমাণের আগেই তাকে নির্মমভাবে মারা হয়েছে।এটি স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এসব অপরাধ নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ আর থানা-পুলিশের অপেক্ষা করতে চান না। গত কয়েক বছরে আইন মানার এই ইকো সিস্টেম একদম ভেঙে পড়েছে।
তিন. সবশেষে ওই রাজকন্যাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, পরম মমতায় যে বাবার ক্ষুধা মেটাতে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুচলেকা নিয়ে পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর দুই মেয়ের পিতা অনিক এখন হাসপাতালে। তাকে খাবার খাইয়ে দেওয়া বড় মেয়ে ভয়ে চুপসে গেছে। বাড়িতে কারও সঙ্গে সেভাবে কথা বলছে না। এই মেয়েটি এখন যে ট্রমা নিয়ে বড় হবে, তার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কষ্টের তুলনাই হবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতই তাকে রাজকন্যা বলা হোক না কেন, সুযোগ পেলে লোকে তাকে ‘চোরের মেয়ে’ বলতেও ছাড়বে না।


