ফেসবুক পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক,এতে প্রকৃত সাংবাদিকেরাও বিপাকে পড়ছেন

প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২১ 128 views
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এখন যে কেউ একটি ফেসবুক পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক, এমনকি সম্পাদক পরিচয় দিয়ে দিচ্ছেন। এতে প্রকৃত সাংবাদিকেরাও বিপাকে পড়ছেন। দায়িত্ব পালনে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আমরা চাই এসব বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হোক। যাতে কেউ সাংবাদিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে।’

‘আমি বুঝি আপনি কতটুকু ক্ষমতাসীন প্রশাসন, …আমি কমিশনার সাহেবকে, ডিসি সাহেবকে ফোন দিচ্ছি। আমি দুঃখিত বলেছি, তারপরও এই রকম আচরণ করেন, …এইটা আমাদের এলাকা, আমি একজন সাংবাদিক, …একজন সংবাদকর্মীর সাথে যদি আপনারা এই আচরণ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সাথে কী আচরণ করবেন। …আমি প্রশাসন ও সাংবাদিক আনতেছি…।’

ফেসবুক লাইভে চিৎকার করে এক ব্যক্তি একনাগারে বলে যাচ্ছেন এসব কথা। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সিলেটের এ রকম ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

শাটডাউন চলাকালে নিজের কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেল পুলিশ আটক করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুক লাইভটি করেন ফয়সাল কাদির (৪০) নামের ওই ব্যক্তি। লাইভে তিনি নিজেকে সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন।

ফয়সালের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। শাহপরান থানায় রোববার রাতে মামলা করেন সিলেট মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট নুরুল আফসার ভূইয়া। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ফয়সাল কাদির ‘পৃথিবীর কণ্ঠ (পিকে) টিভি’ নামে ফেসবুকভিত্তিক একটি পেজ পরিচালনা করেন। ফেসবুকে নিজেকে পিকে টিভির সম্পাদক ও মাতৃজগত নামের একটি পত্রিকার সিলেট ব্যুরো প্রধান হিসেবে দাবি করেছেন ফয়সাল।

শাহপরান থানা পুলিশ জানায়, গত ৯ জুলাই বিকেলে সিলেট-তামাবিল সড়কের সুরমা গেট এলাকায় তিন আরোহী নিয়ে চলা একটি মোটরসাইকেল আটক করে পুলিশ। ফয়সাল কাদির মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন। এ সময় তার মাথায় হেলমেট ছিল না। আটকের পর তিনি মোটরসাইকেলের কাগজপত্র এবং নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্সও দেখাতে পারেননি।

সাংবাদিক পরিচয় দেয়া ফয়সাল কাদির

 

ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা পুলিশের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে,  জানান, মোটরসাইকেল আটকের পর ফয়সাল কাদির নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং মোটরসাইকেল ছাড়িয়ে নিতে চান। এতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ফেসবুকে লাইভ শুরু করেন। তবে এরপরেও তার মোটরসাইকেলটি আটক করে থানায় নেয়া হয়।

 

ফেসবুকে ভাইরাল ওই লাইভে দেখা যায়, মোটরসাইকেল আটকের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তার সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হলো, বারবার তা দায়িত্বরত পুলিশের কাছে জানতে চাইছেন ফয়সাল কাদির। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সাংবাদিকদের ফোন করে তিনি ঘটনাটি জানাচ্ছেন বলেও লাইভে বলতে শোনা যায়।

 

মোটরসাইকেলটি আটকের সময় সুরমা গেটে চেকপোস্টের দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট নুরুল আফসার ভূইয়া। ফয়সালের লাইভের মাঝেই তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনার গাড়িতে তিনজন তুলছেন কেন? গাড়ির কাগজ কই? ড্রাইভিং লাইসেন্স কই?

 

এসব প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল বলেন, ‘আমার গাড়ির সেল রিসিট আছে। আমি অসুস্থ। একটি জরুরি নিউজের খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হয়েছি। তাই এটি সঙ্গে আনতে পারিনি। একটু সময় দিলে নিয়ে আসব।

 

সার্জেন্ট নুরুল লাইভ ক্যামেরার সামনে এসে একাধিকবার বলেন, ‘সাংবাদিক বলে কি সবকিছু মাফ?’

 

জবাবে ফয়সাল বলেন, ‘আপনার গাড়ির কাগজ কই? পুলিশেরও হেলমেট থাকে না। আমি সত্যি বলেছি। তারপরও আমার গাড়ি রেকার করছেন কেন। সিলেটের মানুষ খুব ভালো। এই মাটি খুব ভালো। তাই সিলেটের মানুষ এত আদর করে সোহাগ করে। আর আপনি আইনের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন। গাড়ি চলতেছে। গাড়ি চলার সুবিধা দিয়ে সাধারণ সংবাদকর্মীর সঙ্গে এমন আচরণ করছেন।’

ফেসবুকে এই পেজটি চালান ফয়সাল

 

ফেসবুক লাইভের কমেন্টেই অনেকে ফয়সাল কাদিরের আচরণের নিন্দা করেছেন। সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা, ক্ষমতা প্রদর্শনের নিন্দা করেন মন্তব্যকারীরা। একই সঙ্গে প্রশংসিত হয় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের আচরণ।

 

এ ঘটনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রোববার রাতে ফয়সালের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন সার্জেন্ট নুরুল। এজাহারে ফয়সালের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য সরাসরি প্রচার করে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের।

তিনি  বলেন, ‘আইন অমান্য করায় গত শুক্রবার ফয়সাল কাদিরের মোটরসাইকেলটি রেকার স্লিপের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছিল। এ ছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী বহন, হেলমেটবিহীন আরোহন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালানোর অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

 

‘এ বিষয়কে কেন্দ্র করে ফয়সাল কাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রায় ১৫ মিনিট লাইভ করে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে অস্থির ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করেন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর উপক্রম করেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

 

বিষয়টি নিয়ে জানতে সোমবার ফয়সাল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে।

ফেসবুক লাইভে পুলিশের এই কর্মকর্তার সঙ্গে বাদানুবাদ করতে দেখা যায় ফয়সালকে

 

তবে রোববার রাতে ফেসবুকে পিকে টিভি পেজ থেকে দেয়া একটি লাইভে ফয়সাল কাদির বলেন, ‘ওই দিন আমি অসুস্থ ছিলাম। একটি পারিবারিক ঝামেলার কারণে আমার মনমানসিকতাও ভালো ছিল না। তাই কিছু উল্টাপাল্টা ব্যবহার করে ফেলেছি। পুলিশ সদস্যদের মনে কষ্ট দিয়েছি। এ জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। সবাই আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’

 

মোটরসাইকেল আটকানোর পর ফেসবুকের ওই লাইভে ফয়সাল কাদিরকে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদের নাম একাধিকবার নিতে শোনা যায়। লাইভে ফয়সাল কাদির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা আমার মোটরসাইকেলে হাত দেবেন না। আমি ডিসি সাহেবকে ফোন দিচ্ছি। তিনি এখানে আসবেন। তারপর দেখব।’

 

এ প্রসঙ্গে সোমবার সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই লোককে (ফয়সাল কাদির) আমি চিনি না। অনেকেই তো আমাকে কল দেয়। সব কল রিসিভ করাও হয় না। ওই দিন তার সঙ্গে আমার কোনো আলাপ হয়নি। এর আগে কোনোদিন হয়েছে বলেও মনে করতে পারছি না।’

 

ফয়সাল কাদির নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও তার বিষয়ে সিলেটের মূলধারার সাংবাদিকেরা কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছামির মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মাতৃজগত নামে কোনো পত্রিকার নাম কখনও আমি শুনিনি। এই নামে কোনো পত্রিকা আছে কি না, আমার জানা নেই। ফয়সাল কাদির নামে কোনো সাংবাদিককেও চিনি না। তিনি সিলেটের কোনো সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত নন।

 

তিনি বলেন, ‘এখন যে কেউ একটি ফেসবুক পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক, এমনকি সম্পাদক পরিচয় দিয়ে দিচ্ছেন। এতে প্রকৃত সাংবাদিকেরাও বিপাকে পড়ছেন। দায়িত্ব পালনে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আমরা চাই এসব বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হোক। যাতে কেউ সাংবাদিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে।’

ফয়সাল কাদির

 

যত্রতত্র ফেসবুক লাইভ ও ফেসবুক পেজ খুলে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার বিষয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ইমজা) সিলেটের সভাপতি বাপ্পা ঘোষ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সিটিজেন জার্নালিজমকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এটির এখন ব্যাপক প্রসারও ঘটেছে। তবে যারা সিটিজেন জার্নালিজম করেন, তাদের বুঝতে হবে কী প্রচার করা যায় এবং কী প্রচার করা যাবে না। এইটুকু শিক্ষা, নৈতিকতাবোধ না থাকলে এসব করা অনুচিত। তাতে হিতে বিপরীত হবে।’

বাপ্পা বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, লাইভ পেজ থেকে অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে অসংবেদনশীলভাবে লাইভ করা হচ্ছে। নারী ভিকটিমকে লাইভে আনা হচ্ছে। শিশুকে আনা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে অন্যকে ফাঁসাতে ফেসবুকে পেজ খুলে লাইভ করছেন। এগুলো বন্ধ করা উচিত। প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে।’

সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বন্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাপ্পা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে মূলধারার সাংবাদিকদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা নিজেরা কোনো অন্যায় সুবিধা না নিলে আইন মেনে চললে অন্যরাও এই সুযোগ নিতে পারবে না।’

ফয়সাল কাদিরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অপরাধ করলে মামলা হতে পারে। তবে আমি সব সময় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে। এই আইনে মামলা দায়েরকে আমি সমর্থন করি না।’