শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব সহজ ও আনন্দময় করতে চলতি বছর প্রতিটি পূজামণ্ডপে সরকারি চালের বরাদ্দ ৫০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ সাভারে এসে পৌঁছালেও এর সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ। উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে বরাদ্দকৃত চাল বুঝে পাওয়ার কথা থাকলেও সাভারে ঘটে চলেছে ভিন্ন ঘটনা। সরকারি বরাদ্দপত্র নিয়ে চালের বদলে পূজামণ্ডপ কমিটির হাতে নামমাত্র নগদ টাকা ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভার উপজেলার মোট ২৩৮টি পূজামণ্ডপের জন্য প্রতিটির অনুকূলে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ বরাদ্দপত্র নিয়ে খাদ্যগুদামে গিয়ে চাল খালাস করবেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ বরাদ্দপত্র হাতে পাওয়ার পরপরই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) অফিসে বসেই তা হাতিয়ে নিচ্ছে সাভার পৌর কৃষক দল নেতা মীর রফিকুল ইসলাম সানী। চাল সংগ্রহের সুযোগ না দিয়ে মণ্ডপ প্রতিনিধিদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ হাজার টাকা।
স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই অর্থ ও চাল সিন্ডিকেটের মূল হোতা পৌর কৃষক দলের নেতা মীর রফিকুল ইসলাম সানী। তিনি পিআইও অফিসের সামনে ও ভেতরে অবস্থান নিয়ে নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে চালের বরাদ্দপত্রগুলো জমা করে নিচ্ছেন এবং চালের বিনিময়ে নগদ টাকা পরিশোধ করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত বছর প্রতি মণ্ডপে ৫০০ কেজি চাল বরাদ্দের বিপরীতে সাভারের পূজামণ্ডপগুলো ১৯ হাজার টাকা করে পেয়েছিল। এবার সরকারি সিদ্ধান্তে ১০০ কেজি চাল বরাদ্দ বাড়ানো সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে টাকার অঙ্ক মাত্র ১ হাজার টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারে। অথচ বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ৬০০ কেজি চালের মোট দাম এই প্রদত্ত অঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি। বাজারদর অনুযায়ী প্রতি কেজি সরকারি চালের সর্বনিম্ন মূল্য ৬০ টাকা ধরলেও ৬০০ কেজি চালের দাম হয় প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। অথচ পূজামণ্ডপগুলোকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। ফলে মণ্ডপপ্রতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যা ২৩৮টি মণ্ডপের হিসাবে মোট প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার বিশাল বাণিজ্য গড়ে তুলেছে এই চক্রটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাভারের কয়েকটি পূজামণ্ডপের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারিভাবে চালের বরাদ্দ বাড়ানোর সংবাদে আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের গুদাম থেকে চাল তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। পিআইও অফিস থেকে বরাদ্দপত্র হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সানী ও তার লোকজন এসে তা নিয়ে যায় এবং হাতে ২০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেয়। না মেনে নেওয়ারও উপায় থাকে না, কারণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো পরিবেশ সেখানে নেই।”
এ বিষয়ে সাভার পৌর কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর রফিকুল ইসলাম সানী বলেন, সাভারের পাশবর্তি উপজেলা গুলো যেভাবে টাকা দিচ্ছে আমিও সেভাবেই টাকা দিচ্ছি। আমি তো আর বাড়তি টাকা দিতে পারি না। তিনি বলেন, কোন মন্দির কর্তৃপক্ষ যদি চাল আমার কাছে বিক্রি না করে নিতে চায় নিতে পারবে আমি আটকাবো না। তবে অন্য কোথাও বিক্রি করতে পারবেনা। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তিনি ১০৪টি মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চাল কিনেছেন বলে জানান।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক ভবনের ভেতরেই কীভাবে এই অনিয়ম সম্পন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোঃ ফাইজুল ইসলাম বলেন, সাভার উপজেলায় ২৩৮টি পূজা মন্ডপ রয়েছে। এরমধ্যে সাভার পৌরসভায় তিনটি মণ্ডপে পূজা হবে না। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ১৩০ মন্ডপে ৬০০কেজি করে চালের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয়েছে। চাল নিয়া মন্ডপ কর্তৃপক্ষ বিক্রি করতে পারে আবার সে নিয়েও যেতে পারে এটা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। চাল বিক্রির বিষয়টি আমরা নিয়ন্ত্রণ করছি না। মন্ডপ কর্তৃপক্ষ যেখানে ভালো দাম পাবে সেখানেই বিক্রি করবে এটা নিয়ে সরকারের কোন নির্দেশনা নেই। তাছাড়া আমার এখানে বসে চাল বিক্রি হচ্ছে না। আমার এখানে কোন টাকা-পয়সার লেনদেনও হয়নি। তাছাড়া একজন লোক আসলে তো তারে আর নিষেধ করা যায় না। তারা তো (সিন্ডিকেটের লোকজন) এখানে আসে তাদের (পূজা মন্ডপ কর্তৃপক্ষ) সাথে একটা যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য, এখানে অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই।
সরকারি মানবিক সহায়তা ও ধর্মীয় উৎসবের বরাদ্দ থেকে একটি সিন্ডিকেটের এভাবে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাভারের সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ নাগরিকরা। তাঁরা অবিলম্বে এই চক্র ভেঙে দিয়ে প্রকৃত বরাদ্দের সুফল পূজামণ্ডপগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
সাভার উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দাস বলেন, মন্দিরের চাল সিন্ডিকেটের সাথে আমি জড়িত নই। আমরা সরকারি বরাদ্দের বরাদ্দপত্র দিয়ে দিচ্ছি। এখন মন্দির কর্তৃপক্ষ তাদের চাল বিক্রি করবে নাকি করবে না তাদের একান্ত বিষয়। আমাদের মন্দিরের জন্য আমরা যে বরাদ্দ পাব তা আমরা যেখানে বেশি টাকা পাবো সেখানে বিক্রি করে দিব, কারণ এই চাল পূজায় হবে না।আমাদের আরও ভালো মানের চিকন চাল লাগবে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, পিআইও অফিসে বসে পূজা মন্ডপের বরাদ্দের চাল কেনার কোন সুযোগ নেই। আমরা মন্ডপ কর্তৃপক্ষকে বরাদ্দপত্র দিয়ে দিচ্ছি এখন তারা চাল বিক্রি করবে না নিজেরা নিবে এটা তাদের বিষয়।


