বিলুপ্ত প্রায় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী “ভোলাভুলি” উৎসব

প্রকাশিত: ৫:০৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২১ 219 views
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজ ভোলাভুলি। সিলেটি সংস্কৃতির অন্যতম উপাদেয় অনুষঙ্গ ভোলাভুলি। বাংলা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে ‘বুলাবুলি’ উৎসবের দিন।

এ দিনটি ঘিরে একসময় গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতো গ্রামের শিশু, কিশোর তরুণ-তরুণীরা।

সেই সাথে গ্রামীণ হাটগুলোতে বসতো বিভিন্ন রকমের মাটির খেলনার মেলা। এসময়টা চারিদিকে ধান কাটার ধুম পড়ে যেত; বাড়ি ভরে যেত ফসলের ঘ্রাণে।

 

কলা গাছের পাচল দিয়ে আশ-পাশের বাড়ির, দাদা-দাদি, ভাবী, দোলাভাই এসব রস সম্পর্কের মানুষদের পেটানোর হিড়িক দেখা দিত। কে কাকে পেটাবেন এ নিয়ে রস-ঢংয়ের হুলুস্থুল লেগে যেত।

ভোলাভুলি সংক্রান্তি’ বাঙালীর ঐতিহ্য ও কৃষ্টির একটি অংশ। এক সময় কার্তিক মাসের শেষদিন গ্রাম বাংলার প্রায় ঘরে ঘরেই এ উৎসব হতো। এখনও অনেক গ্রামে এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর বিস্তৃতি কমে এসেছে কয়েক গুণ। গ্রাম বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।

রোববার কার্তিক মাসের শেষ দিন হওয়ায় হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এ অনুষ্ঠান বেশি অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে।

বাঁশ ও খড় দিয়ে মানুষের মত একটি ‘ভোলা’ তৈরি করা হয়। সন্ধ্যায় ছেলে-মেয়েরা একত্রিত হয়ে এই ভোলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমেষেই পোড়ে ছাই হয়ে যায় ভোলা। এ সময় বলা হতো-

 

‘ভোলা পুড়, ভুলি পুড়

 

মশা মাছি বাইর-হ

 

টাকা পয়সা ঘর-ল

সংসারের জঞ্জাল দূর-হ’

‘ভোলাভুলি’র অন্যতম আকর্ষণ ছিল- এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে কলা গাছের ডাল দিয়ে মানুষের ‘ভোলা’ ছাড়ানো। এই ভোলা ছাড়ানোর সময় বলা হতো-

 

‘ভোলা ছাড়, ভুলি ছাড়

 

বার মাইয়া পিছা ছাড়।

 

ভাত খাইয়া লড়চড়

 

পানি খাইয়া পেঠ ভর।

 

খাইয়া না খাইয়া ফোল

হাজার টাকার মূল’

হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান মনে করা হলেও এটি হিন্দু-মুসলিম সবাই সমানভাবে পালন করে থাকেন। যদিও ‘ভোলাভুলি’ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সামব্যাপী চলে আয়োজন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা কার্তিক মাসকে নিয়ম মাস হিসেবে পালন করতো। এ সময় প্রতিদিন সকালে স্নান করে দেবতাকে ভোগ দেয়া হতো। আর মাসব্যাপী এই সংযমের শেষদিন ভোলা সংক্রান্তি হিসেবে এই ‘ভোলাভুলি’ পালন করা হয়।

কিন্তু ‘ভোলাভুলি’ এখন বিলুপ্তের পথে। তবে এখনো গ্রামের কিছু কিছু এলাকায় এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে বর্তমান প্রজন্ম এই ‘ভোলাভুলি’ সম্পর্কে জানেই না।

এ ব্যাপারে স্থানীয়রা বলেন – ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এই ‘ভোলাভুলি’র জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। কখন ‘ভোলাভুলি’ আসবে। ‘ভোলাভুলি’তে সারাদিন ও মাঝরাত পর্যন্ত আমরা অনেক মজা করতাম। কিন্তু এখন আর আগের মতো ‘ভোলাভুলি’ হয় না।

ভোলাভুলির বিশেষ অংশ জুড়ে থাকতো ‘টুফা’ খাওয়া। গ্রামের শিশু-কিশোররা একত্রিত হয়ে টুফা রান্নার আয়োজন করতো। বড়রা এসেও যোগ দিতেন এ আয়োজনে। ছোট-বড়দের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না, সবাই মিলেমিশে আনন্দে মেতে ওঠতো।